bd news time, মহামারীর ১০০ বছরের ইতিহাস

মহামারীর ১০০ বছরের ইতিহাস

বিনোদন আর্টিকেল

মহামারীর ১০০ বছরের ইতিহাস

কাকতালীয় কিনা জানা নেই। বিশেষ কোনও শক্তি এই পৃথিবীর নিয়মকে ঘড়ির কাঁটা ধরে নিয়ন্ত্রণ করেন কিনা তাও অজানা। কিন্তু ১০০ বছর পর পর পৃথিবীতে সব ভয়ঙ্কর মহামারীর ফিরে আসাকে অনেকেই বাঁধছেন অন্য সুতোয়।

মানব ইতিহাসে প্রতি ১০০ বছরে ফিরে আসে মহামারী। পাল্টে দেয় পৃথিবীর চেহারা। কখনো নতুন করে শুরু হয় সভ্যতা। প্লেগ, ইনফ্লুয়েঞ্জা, যক্ষ্মা, কলেরা, গুটিবসন্ত কখনো মহামারী হয়ে এসে কেড়ে নেয় কোটি কোটি মানুষের প্রাণ। মহামারীর কারণে বহু নগরসভ্যতা হারিয়ে গেছে।

প্লেগ, ইনফ্লুয়েঞ্জা, যক্ষা, জিকা ভাইরাস, ইবোলা, মেনিনজাইটিস, চিকুনগুনিয়া, গুটিবসন্ত, মের্স, কলেরা, ইয়েলো ফিভার, সার্স- একুশ শতকের শুরুর দুই দশকেই বিশ্বের ওপর দিয়ে ধেয়ে গেছে বিপজ্জনক ও প্রাণঘাতি এসব মহামারি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এক জরিপে জানিয়েছে, ২০১১ সাল থেকে ২০১৭ সাল, এই ৭ বছরেই গোটা দুনিয়ায় সব মিলিয়ে ১ হাজার ৩০৭টি মহামারি ঘটেছে। যার মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত ও ভয়ঙ্কর ছিল উপরের নামগুলো।

সম্প্রতি চীনের উহান প্রদেশ থেকে ছড়িয়ে পড়া নভেল করোনা ভাইরাসে কাঁপছে গোটা দুনিয়া। চীনসহ বিশ্বের দেশে দেশে ছড়িয়ে পড়ছে এ ভাইরাসের সংক্রমণ। গত একমাসের ব্যবধানে করোনা ভাইরাসে মৃতের সংখ্যা ২ হাজার ছাড়িয়েছে। আক্রান্ত হয়েছে চিকিৎসা নিচ্ছেন অর্ধলক্ষাধিক মানুষ। প্রতিরোধের তেমন প্রস্তুতি না থাকলেও ঝুঁকিতে আছে বাংলাদেশও।

গত দুই হাজার বছরের ইতিহাস পর্যালোচনায় দেখা যায়, প্রতি ১০০ বছরে মানব ইতিহাসে ফিরে আসে এসব মহামারি। আর তা ওলট-পালট করে দেয়া তামাম দুনিয়া। পাল্টে যায় পৃথিবীর চেহারা, গড়ে উঠে নতুন সভ্যতা। আর এসব মহামারি কেড়ে নেয় কোটি কোটি মানুষের প্রাণ। মানব ইতিহাসে ভয়ঙ্কর এসব মহামারিতে বহু নগর সভ্যতা বিলুপ্ত হয়ে গেছে। এমনকি কয়েক হাজার বছর আগের অবিকৃত মিসরীয় মমির গায়েও গুটিবসন্তের চিহ্ন পাওয়া যায়। বিশ্বকে শাসন করা ফারাওরা নিজেদের দেবতা দাবি করলেও তারাও পরাস্ত হয়েছে গুটিবসন্তের কাছে।

ইতিহাস সাক্ষ্য বহন করছে, প্রায় পৌনে দুই হাজার বছর আগে ২৫০ খ্রিস্টাব্দে সাইপ্রিয়ানের প্লেগ রোমান সাম্রাজ্যকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে গিয়েছিল। ১৩৪৬ থেকে ১৩৫৩ এই সময়কালেও মহামারির ভয়ানক থাবা সহ্য করেছিল মানব সম্প্রদায়। যা ইতিহাসে ব্ল্যাক ডেথ নামে কুখ্যাতি পেয়েছিল। এই প্লেগে আক্রান্ত হয়ে তখন প্রায় ৮ কোটি মানুষের মৃত্যু হয়েছিল।

এই প্লেগের জন্ম হয়েছিল মধ্য এশিয়ার সমভূমিতে। যেটি পরবর্তীতে সিল্ক রোড হয়ে ক্রিমিয়ায় পৌঁছে। এক পর্যায়ে বণিকদের জাহাজে বাস করা কালো ইঁদুর ও ইঁদুর মাছি নামে দুটি প্রজাতির মাধ্যমে এই প্লেগ ছড়িয়ে পড়ে ভূমধ্যসাগর হয়ে গোটা ইউরোপে। প্লেগ মহামারির কড়াল গ্রামে চতুর্দশ শতকে বিশ্বের মোট জনগোষ্ঠী ৪৫০ মিলিয়ন থেকে ৩৭৫ মিলিয়নে নেমে আসে।

কালে কালে মানবসভ্যতার ইতিহাসে পৃথিবীর চালচিত্র কীভাবে পাল্টে গেছে তার সাক্ষ্য দেয় মানুষের প্রাচীনতম ফসিলগুলো। তখনও চিকিৎসা বিজ্ঞানের ততটা উন্নতি সাধন হয়নি। যে সময়টাতে মহামারি দেখা দিলে দেখতে দেখতে গোটা একটি জনপদ নিশ্চিহ্ন হয়ে যেতো। ১৬৫ খ্রিস্টাব্দে রোমে গুটিবসন্ত হানা দিয়েছিল। তখন মৃত্যুর হাত থেকে পালিয়েও বাঁচতে পারেনি ওই জনপদের মানুষ। মাত্র ১৫ বছরের ব্যবধানে রোম হয়ে উঠেছিল ভূতের শহর। ৪৩০ খ্রিস্টাব্দের কথা। এথেন্সকে তখন বলা হতো গ্রিসের ফুসফুস। সেই এথেন্সেই মহামারি প্লেগ এসে লাখ লাখ মানুষের প্রাণ কেড়ে নিয়েছিল।

এর ঠিক ১০০ বছর পর অর্থাৎ ষষ্ঠ শতকের প্রথমার্ধে ইউরোপ, মিশর ও পশ্চিম এশিয়ায় প্লেগের ছোবলে গোটা পৃথিবীর প্রায় ৪০ শতাংশ মানুষের মৃত্যু হয়েছিল। দেড় হাজার বছর আগের সেই মহামারিতে মানুষ ঘর থেকে বের হতো না। পঞ্চম শতাব্দিতে রোমান সাম্রাজ্যের ভিত আরও কাঁপিয়ে দিয়েছিল মহামারি প্লেগ। বর্তমান ইরান, মেসোপটেমিয়া অঞ্চলে ‘প্লেগ অব শ্যারো’ মহামারিতে তখন এক বছরে এক লক্ষ মানুষের প্রাণহানি হয়েছিল। পার্সিয়ার অর্ধেক মানুষের মৃত্যু হয়েছিল।

এত মানুষের প্রাণ নিয়েও পিছু ছাড়েনি এসব মহামারি। ৭৩৫ থেকে ৭৩৭ সাল, এই দুবছরে গুটিবসন্ত বা স্মল পক্সের ছোবলে জাপান প্রায় জনমানবহীন হয়ে পড়েছিল। জাপানে এক তৃতীয়াংশ মানুষের মৃত্যু হয়েছিল তখন। ওই শতাব্দিতেই প্লেগে ধ্বংসের কিনারায় পৌঁছে গিয়েছিল বাইজান্টাইন সাম্রাজ্য।

ষোলো শতকে নিউ স্পেনে (বর্তমান মেক্সিকো) স্যালমোনেলা জাতীয় ব্যাকটেরিয়ায় পুরোপুরি ধ্বংসের মুখে পড়েছিল অ্যাজটেক সভ্যতা। ওই জনপদের ৮০ শতাংশ মানুষ মারা গিয়েছিল। এর পর ১৫৬৩ খ্রিস্টাব্দে লন্ডনে প্লেগে ২০ হাজার মানুষের প্রাণহানি হয়। তবে লন্ডনে সবচেয়ে বীভৎস মহামারির আঘাতটি এসেছিল ১৬১৬ সালে। সে বছর স্মল পক্স, ইনফ্লুয়েঞ্জা, টাইফাসসহ অজানা কিছু ভাইরাস জ্বলে শহরটির ৯০ শতাংশ মানুষ আক্রান্ত হয়েছিল। ঘরে ঘরে ছিল মৃত্যুর রোল। গোটা লন্ডন শহরটি হয়ে উঠেছিল মৃত্যুপুরী। এর প্রায় ১৫ বছর ১৬২৯-১৬৩১ সালে ইতালিতে প্লেগের থাবায় আড়াই লাখ মানুষের অকাল মৃত্যু হয়েছিল। এর পরের শতকে ১৭৩৮ সালে প্লেগে বলকান অঞ্চলে অর্ধলক্ষ মানুষের প্রাণহানি হয়েছিল। ওই শতকেই রাশিয়া ও পার্সিয়ায় মৃত্যু হয় দুই লাখ মানুষের।

উনিশ শতকে পৃথিবীতে হানা দিলো নতুন মহামারি কলেরা। মাত্র ১০ বছরের ব্যবধানে ইউরোপ ও এশিয়ায় মৃত্যু হলো এক লাখ মানুষের। ওই সময় কলেরা প্রতিরোধের কোনও উপায়ও জানা ছিল না। তখন কলেরা মানেই মৃত্যু ছিল নিশ্চিত। বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়া কলেরায় তখন লাখ লাখ মানুষ প্রাণ হারাচ্ছিল। শুধু রাশিয়াতেই মারা যায় এক লাখ মানুষ।

বিংশ শতাব্দির শুরুতে তামাম দুনিয়ায় আতঙ্কের নাম হয়ে উঠেছিল ইনফ্লুয়েঞ্জ। জ্বরের নমুনায় শরীরে আসা এই রোগে প্রায় এক লাখ মানুষের মৃত্যু হয়। ওই শতকেই চীনে প্লেগ কেড়ে নেয় আরও প্রায় ৫০ হাজার মানুষের প্রাণ। তবে বিশ শতকে সবচেয়ে আলোচিত মহামারির নাম ছিল এশিয়ান ফ্লু। পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি দেশে ছড়িয়ে পড়া এই রোগে দুই লক্ষেরও বেশি মানুষের মৃত্যু হয়। এরপর ১৯৬০ সালে এইচআইভি বা এইডসের ছোবল। এই ভাইরাসে এখন পর্যন্ত গোটা দুনিয়ায় ৩০ লাখ মানুষ মারা গেছে। একসময় পোলিওতেও বিশ্বের নানা প্রান্তে বহু মানুষের প্রাণ ঝরেছে।

তবে একুশ শতকে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বড় মহামারি হিসেবে আঘাত হেনেছে নভেল করোনা ভাইরাস। একবিংশ শতাব্দির প্রথম দুই দশকেই সার্স, মার্স, ডেঙ্গু, জিকা, ইবোলার মতো মারণ ভাইরাসের মুখে পড়েছে পৃথিবী। তবে ২০২১ সালের শুরুতে নতুন শতকের আগের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে করোনা ভাইরাস। এ ভাইরাসে এখন পর্যন্ত প্রায় পৌনে এক লাখ মানুষ আক্রান্ত হয়েছে। ২৮টি দেশে আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হয়েছে। মৃত্যু হয়েছে প্রায় ২ সহস্রাধিক মানুষের।

পূর্বপশ্চিম

উবারের ‘শেয়ারিং রাইড’ সেবা সাময়িক বন্ধ!

Share Now

1 thought on “মহামারীর ১০০ বছরের ইতিহাস

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *