মূল লেখায় যান
শনিবার, ২৪ অক্টোবর ২০২৬ · ৮ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
শিরোনাম
শিক্ষা

প্রাথমিক ও মাধ্যমিকে যুক্ত হচ্ছে নতুন ৪টি বই, বদলাবে শিখন পদ্ধতি

মুখস্থবিদ্যা ও পরীক্ষাকেন্দ্রিক শিক্ষার বাইরে গিয়ে শিক্ষার্থীদের আনন্দময়, জীবনমুখী ও দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষায় গড়ে তুলতে ২০২৭ শিক্ষাবর্ষে চতুর্থ ও ষষ্ঠ শ্রেণিতে যুক্ত হচ্ছে নতুন চারটি পাঠ্যবই। শিক্ষার্থীদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশ, নৈতিক মূল্যবোধ, সৃজনশীল চিন্তাশক্তি এবং বাস্তবমুখী কর্মদক্ষতা বাড়ানোর লক্ষ্য নিয়ে বইগুলো প্রণয়ন করেছে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড।

প্রাথমিক ও মাধ্যমিকে যুক্ত হচ্ছে নতুন ৪টি বই, বদলাবে শিখন পদ্ধতি

মুখস্থবিদ্যা ও পরীক্ষাকেন্দ্রিক শিক্ষার বাইরে গিয়ে শিক্ষার্থীদের আনন্দময়, জীবনমুখী ও দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষায় গড়ে তুলতে ২০২৭ শিক্ষাবর্ষে চতুর্থ ও ষষ্ঠ শ্রেণিতে যুক্ত হচ্ছে নতুন চারটি পাঠ্যবই। শিক্ষার্থীদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশ, নৈতিক মূল্যবোধ, সৃজনশীল চিন্তাশক্তি এবং বাস্তবমুখী কর্মদক্ষতা বাড়ানোর লক্ষ্য নিয়ে বইগুলো প্রণয়ন করেছে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড।

নতুন বইগুলো হলো চতুর্থ শ্রেণির ‘খেলাধুলা’ ও ‘বাংলাদেশের সংস্কৃতি’ এবং ষষ্ঠ শ্রেণির ‘লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস’ ও ‘আমার কারিগরি শিক্ষা’।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, শিক্ষাব্যবস্থাকে আনন্দময়, বাস্তবমুখী ও নৈতিক মূল্যবোধসম্পন্ন করে তুলতে সরকারের পরিকল্পনার অংশ হিসেবে নতুন বইগুলো পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্তির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা উপদেষ্টা মাহদী আমিন বলেন, রাষ্ট্রকাঠামো সংস্কারের পরিকল্পনার অংশ হিসেবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান শিক্ষা খাতের প্রয়োজনীয় সংস্কারে গুরুত্ব দিয়েছেন। শিক্ষাব্যবস্থাকে আনন্দময়, বাস্তবমুখী ও নৈতিক মূল্যবোধসম্পন্ন করে তুলতে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করা হয়েছে। সেই চিন্তাভাবনা, অভিজ্ঞতা ও গবেষণার প্রতিফলন হিসেবে নতুন বইগুলো পাঠ্যক্রমে যুক্ত করা হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, শিক্ষার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মধ্যে মানবিক মূল্যবোধ, সামাজিক শিষ্টাচার, পারিবারিক সংস্কৃতি ও সুনাগরিকের গুণাবলি গড়ে তোলার পাশাপাশি কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরির লক্ষ্য রয়েছে। এ উদ্যোগ বাস্তবায়নে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের একটি দল কাজ করছে। পাশাপাশি বিভিন্ন পর্যায়ের শিক্ষাবিদ ও বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে ধারাবাহিক আলোচনা ও পরামর্শের ভিত্তিতে বইগুলোর বিষয়বস্তু তৈরি করা হয়েছে।

জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের সংশ্লিষ্টরা জানান, সরকারের নির্বাচনি ইশতেহার অনুযায়ী আনন্দ, খেলাধুলা, সংস্কৃতি ও হাতে কলমে কারিগরি দক্ষতার সমন্বয়ে বইগুলো তৈরি করা হয়েছে। আগামী ২৫ অক্টোবর জাতীয় শিক্ষাক্রম সমন্বয় কমিটির সভায় বইগুলোর চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়ার কথা রয়েছে। চারটি বইয়ের প্রায় ১ কোটি ৫০ লাখ কপি মুদ্রণের পরিকল্পনা করা হয়েছে।

বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মোহাম্মদ ফখরুল মাওলা বলেন, নতুন চারটি পাঠ্যবইয়ের পাণ্ডুলিপি প্রণয়ন ও যাচাইয়ের কাজ ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে। ২৫ অক্টোবর জাতীয় শিক্ষাক্রম সমন্বয় কমিটির সভায় অনুমোদন পাওয়ার পর বইগুলোর বিষয়বস্তু মুদ্রণের জন্য ছাপাখানায় পাঠানো হবে।

বোর্ড সূত্র জানায়, গত ১২ জুলাই আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটে চার মন্ত্রণালয়ের উচ্চপর্যায়ের কর্মশালায় বইগুলোর রূপরেখা উপস্থাপন করা হয়। পরে বিশেষজ্ঞ ও শিক্ষাবিদদের সমন্বয়ে চূড়ান্ত পাণ্ডুলিপি তৈরি করা হয়।

বোর্ডের সদস্য অধ্যাপক মোহাম্মাদ আবু নাসের টুকু জানান, নতুন চারটি বই মুদ্রণের প্রস্তুতি চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। কমিটির অনুমোদন পাওয়ার পর আগামী ১৫ ডিসেম্বরের মধ্যে প্রায় দেড় কোটি কপি বই মুদ্রণের কাজ শেষ করার আশা করা হচ্ছে।

খেলাধুলা বইয়ে গুরুত্ব পাবে সুস্থ জীবনধারা ও আত্মরক্ষা

চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের বয়স ও মানসিক বিকাশ বিবেচনায় ১৪টি অধ্যায়ে সাজানো হয়েছে ‘খেলাধুলা’ বইটি। শিশুদের ছোটবেলা থেকেই সুস্থ জীবনধারা ও খেলাধুলার প্রতি আগ্রহী করে তোলাই এর মূল লক্ষ্য।

বইটিতে ফুটবল, ক্রিকেট, কাবাডি, ব্যাডমিন্টন, সাঁতার, অ্যাথলেটিকস ও দাবাসহ বিভিন্ন খেলার মৌলিক নিয়ম সহজভাবে তুলে ধরা হয়েছে। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের শারীরিক সক্ষমতা বাড়ানো ও আত্মরক্ষার কৌশল শেখাতে কারাতে, জুডো ও তায়কোয়ান্দোর মতো বিষয়ও রাখা হয়েছে।

খেলার মাঠে বা দৌড়ানোর সময় কেটে যাওয়া, মচকানো, নাক দিয়ে রক্ত পড়া কিংবা হিট স্ট্রোকের মতো পরিস্থিতিতে কী করণীয়, তা বাস্তবসম্মত ছবির মাধ্যমে বোঝানো হবে। শিক্ষার্থীরা জরুরি প্রয়োজনে প্রাথমিক চিকিৎসাসামগ্রীর ব্যবহার ও আঘাত প্রতিরোধের কৌশলও শিখবে। এ ছাড়া পুষ্টি, সামাজিক দক্ষতা ও দেশপ্রেমের বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

বইটির প্রথম অধ্যায়ে ‘স্বপ্ন যখন আকাশ ছোঁয়া’ শিরোনামে একটি অনুপ্রেরণামূলক গল্প রাখা হয়েছে। এতে প্রত্যন্ত গ্রামের একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক আয়মান স্যার ও তার সহকর্মী সাদিয়া আপার উদ্যোগে মেয়েদের ফুটবল দল গড়ে ওঠার গল্প তুলে ধরা হয়েছে।

সামাজিক বাধা ও কুসংস্কার পেরিয়ে মেহজাবিনসহ কয়েকজন শিক্ষার্থীর ইউনিয়ন, উপজেলা, জেলা ও বিভাগীয় পর্যায় পেরিয়ে জাতীয় পর্যায়ে সাফল্য অর্জনের কাহিনির মাধ্যমে দেখানো হয়েছে, খেলাধুলা শুধু শরীর সুস্থ রাখে না, বরং পেশা হিসেবেও আর্থসামাজিক পরিবর্তন ও জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে ভূমিকা রাখতে পারে।

এনসিটিবির চেয়ারম্যান বলেন, শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা যাতে একমুখী ও ক্লান্তিকর না হয়ে ওঠে, সে বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে প্রথমবারের মতো ‘খেলাধুলা’ বইটি প্রণয়ন করা হয়েছে।

বাংলাদেশের সংস্কৃতি বইয়ে উঠে আসবে ঐতিহ্য ও মূল্যবোধ

দেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও লোকজ সংস্কৃতির সঙ্গে শিক্ষার্থীদের পরিচিত করতে ১১টি অধ্যায়ে তৈরি করা হয়েছে ‘বাংলাদেশের সংস্কৃতি’ বইটি। এতে ভাষা, পোশাক, শিল্পকলা, খাদ্যসংস্কৃতি, সামাজিক রীতিনীতি এবং ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ঐতিহ্যবাহী জীবনধারা বর্ণিল চিত্রের মাধ্যমে তুলে ধরা হয়েছে।

বইটিতে বাংলা বর্ণমালা চর্চা, বিদ্যালয়ের উৎসব, জাতীয় পতাকা উত্তোলন এবং পিঠাপুলির ঐতিহ্যের পাশাপাশি পারিবারিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও গৃহস্থালির কাজে পারস্পরিক সহযোগিতার বিষয়ও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

এ ছাড়া শিশু-কিশোরদের জনপ্রিয় প্রতিভা অন্বেষণমূলক আয়োজন ‘নতুন কুঁড়ি’র ইতিহাস, ১৯৭৬ সালে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের উদ্যোগ এবং আয়োজনটির বিজয়ীদের দুর্লভ ছবি যুক্ত করা হয়েছে।

লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস বইয়ে থাকবে আনন্দময় শিখন পদ্ধতি

ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের জন্য ছয়টি অধ্যায়ে তৈরি করা হয়েছে ‘লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস’ বইটি। পড়াশোনার ভয় দূর করে আনন্দময় পরিবেশে শেখার সুযোগ তৈরি করাই এর মূল উদ্দেশ্য।

প্রচলিত পরীক্ষাকেন্দ্রিক ব্যবস্থার বাইরে গিয়ে আনন্দময় অভিজ্ঞতা, পারস্পরিক মিথস্ক্রিয়া ও সহশিক্ষা কার্যক্রমের মাধ্যমে কীভাবে জ্ঞান অর্জন করা যায়, তা বইটিতে তুলে ধরা হবে। এর ফলে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার চাপ কমবে বলে আশা করছে এনসিটিবি।

নিজের স্বাস্থ্য, চারপাশের পরিবেশ ও দৈনন্দিন অভিজ্ঞতার সঙ্গে পাঠ্যবিষয়কে যুক্ত করে শিক্ষার্থীরা সহজ ও আনন্দঘন উপায়ে শিখনফল অর্জন করতে পারবে।

এনসিটিবির কর্মকর্তারা জানান, বইটির মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা বুঝতে পারবে, শেখা শুধু মুখস্থ করা কিংবা পরীক্ষার প্রস্তুতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। নিজের জীবন, স্বাস্থ্য, পরিবেশ, নিরাপত্তা, সৃজনশীলতা, পারস্পরিক সম্পর্ক ও দৈনন্দিন অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়েও জ্ঞান অর্জন সম্ভব।

আমার কারিগরি শিক্ষা বইয়ে থাকবে হাতে কলমে দক্ষতা অর্জনের সুযোগ

একবিংশ শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় শিক্ষার্থীদের হাতে কলমে শেখার অভ্যাস ও সমস্যা সমাধানের সক্ষমতা বাড়াতে ষষ্ঠ শ্রেণির ‘আমার কারিগরি শিক্ষা’ বইটি আটটি অধ্যায়ে সাজানো হয়েছে।

শিক্ষার্থীদের শুধু তাত্ত্বিক জ্ঞানের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে বাস্তবে কী করতে পারে, সেই দক্ষতা অর্জনে সহায়তা করাই বইটির মূল লক্ষ্য।

কারিগরি শিক্ষার পরিচিতি, চারপাশের প্রযুক্তি ও নতুন বিশ্ব, ছোট উদ্যোগের সম্ভাবনা, প্রযুক্তিনির্ভর উদ্ভাবন, সবুজ প্রযুক্তি ও টেকসই জীবনযাপনের মতো বিষয় এতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। বাস্তব জীবনের কারিগরি সমস্যা চিহ্নিত করা এবং প্রযুক্তির সহায়তায় সহজ সমাধান খুঁজে বের করার ভিত্তি তৈরি করবে বইটি।

এ ছাড়া নতুন চারটি বইয়েই শব্দকোষের মতো বিশেষ অধ্যায় যুক্ত করা হয়েছে।

উপদেষ্টা মাহদী আমিন জানান, আগামী শিক্ষাবর্ষে চতুর্থ শ্রেণি থেকে খেলাধুলা ও সংস্কৃতিবিষয়ক শিক্ষা চালু করে পরবর্তী সময়ে প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে। অন্যদিকে ‘লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস’ ও কারিগরি শিক্ষা ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত করা হবে।

এনসিটিবির সদস্য অধ্যাপক ড. এ কে এম শওকত আলী খান বলেন, নতুন চারটি পাঠ্যবই চালু হলে শিক্ষার্থীরা পুঁথিগত বিদ্যার বাইরে গিয়ে আনন্দময় পরিবেশে বাস্তবমুখী ও দক্ষতাভিত্তিক জ্ঞান অর্জনের সুযোগ পাবে।

সূত্র: বাসস

মন্তব্য

এখনো কেউ মন্তব্য করেননি। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।

আপনার মতামত লিখুন

০/২০০০