মূল লেখায় যান
শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর ২০২৬ · ৭ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
শিরোনাম
সারাবিশ্ব

দক্ষিণ কোরিয়াকে কিমের বোনের হুঁশিয়ারি

উত্তর ও দক্ষিণ কোরিয়ার মধ্যে সীমান্ত উত্তেজনা নতুন করে বাড়ছে। দক্ষিণ কোরিয়াকে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছেন উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উনের প্রভাবশালী বোন কিম ইয়ো জং। তিনি জানিয়েছেন, আগামী কয়েক দিনের মধ্যে দুই দেশের সীমান্তজুড়ে দক্ষিণ কোরিয়াবিরোধী প্রচারণার লাউডস্পিকার স্থাপনের প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হবে। একই সঙ্গে যেকোনো ধরনের...

দক্ষিণ কোরিয়াকে কিমের বোনের হুঁশিয়ারি

উত্তর ও দক্ষিণ কোরিয়ার মধ্যে সীমান্ত উত্তেজনা নতুন করে বাড়ছে। দক্ষিণ কোরিয়াকে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছেন উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উনের প্রভাবশালী বোন কিম ইয়ো জং। তিনি জানিয়েছেন, আগামী কয়েক দিনের মধ্যে দুই দেশের সীমান্তজুড়ে দক্ষিণ কোরিয়াবিরোধী প্রচারণার লাউডস্পিকার স্থাপনের প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হবে। একই সঙ্গে যেকোনো ধরনের উসকানিমূলক কর্মকাণ্ডের জবাব দিতে পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও জানিয়েছেন তিনি। পিয়ংইয়ংয়ের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে সিউল হস্তক্ষেপ অব্যাহত রাখলে দক্ষিণ কোরিয়াকে অত্যন্ত ভয়াবহ ও দুর্বিষহ পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন কিম ইয়ো জং।

জ্যেষ্ঠ সামরিক কর্মকর্তাদের সঙ্গে সীমান্ত প্রতিরক্ষা ও দুর্গ নির্মাণ কার্যক্রম পরিদর্শনের পর কিম ইয়ো জং এসব বক্তব্য দেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, অক্টোবরের শেষ নাগাদ সীমান্তজুড়ে লাউডস্পিকার স্থাপন ও সক্রিয় করার প্রস্তুতি সম্পন্ন করবে উত্তর কোরিয়া। এদিকে দেশটির কৌশলগত সামরিক ইউনিটগুলোও নতুন অবস্থান গ্রহণ করেছে বলে তিনি জানান। একই সঙ্গে সীমান্ত এলাকায় দক্ষিণ কোরিয়ার সেনাদের বিরুদ্ধে সতর্কতামূলক মাইক প্রচার এবং কয়েকটি স্থানে সতর্কতামূলক গুলি চালানোর অভিযোগ তোলেন তিনি।

তবে দক্ষিণ কোরিয়া জানিয়েছে, সীমান্তে তাদের সেনাদের গুলিবর্ষণ ছিল বৈধ ও আত্মরক্ষামূলক পদক্ষেপ। সিউলের দাবি, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং সীমান্তের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই এ ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। দুই দেশের পাল্টাপাল্টি বক্তব্যে সীমান্ত পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

দক্ষিণ কোরিয়ার সামরিক বাহিনীকে উদ্দেশ করে কিম ইয়ো জং আরও কঠোর ভাষায় হুঁশিয়ারি দেন। তিনি বলেন, দক্ষিণ কোরিয়ার সতর্কতামূলক গুলির কারণে উত্তর কোরিয়ার ভূখণ্ড বা কোনো সামরিক সদস্য সামান্যতম ক্ষতির শিকার হলেও তার কঠোর জবাব দেওয়া হবে। এ ক্ষেত্রে উত্তর কোরিয়ার সেনারা দক্ষিণ কোরিয়ার বাহিনীর বিরুদ্ধে কোনো ধরনের ছাড় দেবে না বলেও হুঁশিয়ারি দেন তিনি।

উত্তর কোরিয়ার এমন কঠোর বক্তব্যের পর দক্ষিণ কোরিয়ার প্রতিরক্ষা ও একত্রীকরণ মন্ত্রণালয় দুই দেশের মধ্যে সংলাপ পুনরায় শুরু করার আহ্বান জানিয়েছে। সিউল মনে করছে, পাল্টাপাল্টি সামরিক পদক্ষেপ ও হুমকির পরিবর্তে আলোচনার মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তি করা জরুরি। তবে পিয়ংইয়ংয়ের নতুন করে লাউডস্পিকার চালুর প্রস্তুতি দুই দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার প্রচেষ্টাকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।

দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট লি জে মিয়ংয়ের সরকারের জন্যও পরিস্থিতিটি একটি বড় কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে। দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে উত্তেজনা কমানো এবং আন্তকোরীয় সম্পর্ক উন্নয়নে কূটনৈতিক উদ্যোগের ওপর গুরুত্ব দিয়ে আসছে তাঁর সরকার। কিন্তু সীমান্তে নতুন করে প্রচারণা, সামরিক সতর্কতা এবং পাল্টাপাল্টি হুমকির ঘটনায় সেই প্রচেষ্টা বাধার মুখে পড়তে পারে। পরিস্থিতির অবনতি হলে দুই দেশের মধ্যে সামরিক উত্তেজনা আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

ঐতিহাসিকভাবে উত্তর ও দক্ষিণ কোরিয়া সীমান্ত এলাকায় লাউডস্পিকার ব্যবহার করে একে অপরের বিরুদ্ধে প্রচারণা চালিয়ে এসেছে। দক্ষিণ কোরিয়া এসব লাউডস্পিকারের মাধ্যমে কে-পপ সংগীত, আন্তর্জাতিক সংবাদ এবং উত্তর কোরিয়ার শাসনব্যবস্থার সমালোচনামূলক বার্তা প্রচার করত। এসব সম্প্রচারকে নিজেদের শাসনব্যবস্থার জন্য হুমকি হিসেবে দেখে আসছে পিয়ংইয়ং। এর জবাবে উত্তর কোরিয়াও পাল্টা প্রচারণা চালিয়েছে। ফলে লাউডস্পিকার দুই দেশের দীর্ঘদিনের মনস্তাত্ত্বিক ও প্রচারণামূলক সংঘাতের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপকরণে পরিণত হয়েছে।

১৯৫০ থেকে ১৯৫৩ সাল পর্যন্ত চলা কোরীয় যুদ্ধের অবসান ঘটে অস্ত্রবিরতি চুক্তির মাধ্যমে। তবে যুদ্ধের আনুষ্ঠানিক শান্তিচুক্তি না হওয়ায় দুই দেশের মধ্যে এখনো স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়নি। সীমান্তে গড়ে তোলা হয়েছে অসামরিকীকৃত অঞ্চল বা ডিমিলিটারাইজড জোন (ডিএমজেড), যা বিশ্বের অন্যতম সামরিকভাবে সুরক্ষিত সীমান্ত হিসেবে পরিচিত। ২০২৪ সাল থেকে উত্তর কোরিয়া সীমান্ত এলাকায় মাইন পুঁতে রাখা, ব্যারিকেড নির্মাণ এবং কাঁটাতারের বেড়া স্থাপনের মতো প্রতিরক্ষামূলক কার্যক্রম জোরদার করেছে। দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে স্থায়ীভাবে সীমান্ত নির্ধারণের বৃহত্তর উদ্যোগের অংশ হিসেবে এসব পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এদিকে, ডিএমজেড এলাকায় উত্তর কোরিয়ার মাইন পুঁতে রাখার কার্যক্রম নিয়ে নতুন করে বিরোধ দেখা দিয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়ার অভিযোগ, উত্তর কোরিয়ার পুঁতে রাখা মাইনের কারণে গত মাসে একটি বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে, যাতে তাদের দুই সেনা গুরুতর আহত হন। তবে পিয়ংইয়ং এ অভিযোগ অস্বীকার করেছে। উত্তর কোরিয়ার দাবি, দক্ষিণ কোরিয়ার বক্তব্য ভিত্তিহীন এবং ঘটনাটি নিয়ে সিউল বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রচার করছে।

এ ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে দক্ষিণ কোরিয়া জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে আনুষ্ঠানিক চিঠি পাঠানোর উদ্যোগ নিয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। চিঠিতে মাইন বিস্ফোরণের জন্য উত্তর কোরিয়াকে দায়ী করার পাশাপাশি ঘটনাটিকে কোরীয় যুদ্ধের অস্ত্রবিরতি চুক্তির লঙ্ঘন হিসেবে তুলে ধরার কথা রয়েছে। একই সঙ্গে পিয়ংইয়ংয়ের কাছে আনুষ্ঠানিক ক্ষমা চাওয়ার দাবি জানাতে পারে সিউল। তবে সীমান্তে উত্তেজনা প্রশমনে আলোচনার পথ খোলা রাখার ওপরও জোর দিচ্ছে দক্ষিণ কোরিয়া।

সব মিলিয়ে, সীমান্তে লাউডস্পিকার চালুর প্রস্তুতি, মাইন বিস্ফোরণ নিয়ে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ এবং সামরিক হুঁশিয়ারি উত্তর ও দক্ষিণ কোরিয়ার সম্পর্ককে আরও সংঘাতপূর্ণ করে তুলছে। দুই পক্ষের মধ্যে কূটনৈতিক যোগাযোগ ও আস্থা তৈরির উদ্যোগ জোরদার না হলে সীমান্ত পরিস্থিতি আরও অস্থিতিশীল হয়ে উঠতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

মন্তব্য

এখনো কেউ মন্তব্য করেননি। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।

আপনার মতামত লিখুন

০/২০০০