মূল লেখায় যান
শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর ২০২৬ · ৭ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
শিরোনাম
সারাদেশ

দুই দশক ধরে বর্জ্যের যন্ত্রণায় ছয়বাড়িয়াবাসী, দূষণে বিপন্ন জনজীবন

একসময় যে সড়কের দুই পাশে ছিল সবুজের সমারোহ, সেখানে এখন দাঁড়িয়ে আছে পাতাহীন কালচে গাছ। যে বাড়িগুলোর জানালা খুলে ভোরের নির্মল বাতাস উপভোগ করার কথা, সেসব বাড়ির জানালা এখন দুর্গন্ধের ভয়ে দিন-রাত বন্ধ রাখতে হয়। বাতাসে পচা বর্জ্যের তীব্র গন্ধ, সড়কজুড়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা আবর্জনা আর দূষিত পানির প্রবাহ-সব...

দুই দশক ধরে বর্জ্যের যন্ত্রণায় ছয়বাড়িয়াবাসী, দূষণে বিপন্ন জনজীবন

একসময় যে সড়কের দুই পাশে ছিল সবুজের সমারোহ, সেখানে এখন দাঁড়িয়ে আছে পাতাহীন কালচে গাছ। যে বাড়িগুলোর জানালা খুলে ভোরের নির্মল বাতাস উপভোগ করার কথা, সেসব বাড়ির জানালা এখন দুর্গন্ধের ভয়ে দিন-রাত বন্ধ রাখতে হয়। বাতাসে পচা বর্জ্যের তীব্র গন্ধ, সড়কজুড়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা আবর্জনা আর দূষিত পানির প্রবাহ-সব মিলিয়ে বসবাসের অনুপযোগী হয়ে উঠেছে ব্রাহ্মণবাড়িয়া পৌরসভার ছয়বাড়িয়া এলাকার পরিবেশ। দুর্গন্ধ এড়াতে পথচারীরা নাক-মুখ চেপে দ্রুত সড়ক পার হওয়ার চেষ্টা করেন। অথচ এই পথ দিয়েই প্রতিদিন যাতায়াত করতে হয় অসংখ্য মানুষকে।

প্রায় দুই দশক ধরে পৌরসভার বর্জ্য ফেলার স্থানটি ঘিরে এমন দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন ছয়বাড়িয়া ও আশপাশের এলাকার বাসিন্দারা। বছরের পর বছর জমতে জমতে বর্জ্যের স্তূপ এখন বিশাল পাহাড়ে পরিণত হয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দুর্গন্ধ, পরিবেশদূষণ, দূষিত পানি এবং স্বাস্থ্যঝুঁকির আশঙ্কা। সমস্যা সমাধানের দাবিতে স্থানীয় বাসিন্দারা বিভিন্ন সময়ে প্রতিবাদ, মানববন্ধন ও নানা কর্মসূচি পালন করলেও এখনো মেলেনি স্থায়ী সমাধান। দীর্ঘদিনের এই দুর্ভোগ থেকে কবে মুক্তি মিলবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তায় দিন কাটছে তাঁদের।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া পৌরসভা সূত্রে জানা গেছে, ১৮ দশমিক ৫ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এই পৌরসভায় জনসংখ্যা ২ লাখ ৬৪ হাজার ৩৪১ জন। পৌর এলাকায় প্রতিদিন গড়ে ১২০ থেকে ১২২ টন বর্জ্য উৎপন্ন হয়। এর মধ্যে ১২টি ওয়ার্ডের বাসাবাড়ি থেকে আসে প্রায় ৮০ থেকে ৮৫ টন বর্জ্য। এ ছাড়া বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান থেকে প্রতিদিন আরও ৩৫ থেকে ৩৭ টন বর্জ্য সংগ্রহ করা হয়। এসব বর্জ্য অপসারণে চারটি ট্রাক, দুটি ট্র্যাক্টর, ছয়টি নসিমন ও আটটি ভ্যানগাড়ি ব্যবহার করা হচ্ছে। প্রতিদিন এসব যানবাহনে করে বর্জ্য নিয়ে ফেলা হয় ছয়বাড়িয়া এলাকার ১ একর ৩৮ শতাংশ জমির ওপর অবস্থিত ডাম্পিং স্টেশনে।

পৌরসভা সূত্রে আরও জানা গেছে, ২০০৭-০৮ সাল থেকে এই স্থানে বর্জ্য ফেলার কার্যক্রম শুরু হয়। এরপর থেকে দীর্ঘ সময় ধরে সেখানে বর্জ্য জমা হচ্ছে। বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কাজে দুটি এক্সকাভেটর ও একটি লরি রয়েছে। এ ছাড়া পরিচ্ছন্নতাকাজে নিয়োজিত আছেন ১৫০ থেকে ১৬০ জন কর্মী। বিপুলসংখ্যক পরিচ্ছন্নতাকর্মী ও যানবাহন দিয়ে প্রতিদিন বর্জ্য সংগ্রহ করা হলেও নির্দিষ্ট স্থানে দীর্ঘদিন ধরে বর্জ্য জমতে থাকায় পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে না বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।

সরেজমিনে দেখা গেছে, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কালীবাড়ি মোড় থেকে গোকর্ণঘাট পর্যন্ত সড়কের ছয়বাড়িয়া অংশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে নানা ধরনের ময়লা-আবর্জনা। ডাম্পিং স্টেশন থেকে বেরিয়ে আসা কালচে ও দূষিত পানি গড়িয়ে পড়ছে সড়কের ওপর। এতে সড়কটি দিয়ে চলাচলকারী মানুষকে দুর্গন্ধের পাশাপাশি অপরিচ্ছন্ন পরিবেশের মধ্য দিয়ে যাতায়াত করতে হচ্ছে। বিশেষ করে বর্জ্যের স্তূপের কাছাকাছি এলেই দুর্গন্ধের তীব্রতা বেড়ে যায়। নাক-মুখ চেপে ধরেও স্বস্তি পাওয়া যায় না বলে জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।

ডাম্পিং স্টেশনের পশ্চিম পাশে সড়কের ধারে দাঁড়িয়ে থাকা গাছগুলোর অবস্থাও উদ্বেগজনক। একসময় সবুজে ভরা এসব গাছ এখন কালচে ও পাতাহীন হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। গাছগুলোর এমন বিবর্ণ অবস্থা দেখে পরিবেশদূষণের প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করছেন এলাকাবাসী। তাঁদের অভিযোগ, বর্জ্য থেকে ছড়ানো দুর্গন্ধ, ধোঁয়া ও দূষিত পদার্থ আশপাশের পরিবেশকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। বিশেষ করে বর্ষা ও শীত মৌসুমে দুর্ভোগ আরও বেড়ে যায়।

স্থানীয় বাসিন্দা ফিরোজ মিয়া বলেন, “নাক চেপে ধরে এই সড়ক দিয়ে হাঁটতে হয়। দুর্গন্ধ এতটাই তীব্র যে, অনেক সময় পেট ফুলে যাওয়ার মতো অস্বস্তি হয়। এভাবে আর কত দিন চলতে হবে? এখান থেকে এসব ময়লা কি কোনো দিন সরানো হবে না? এই সড়কটি শহরে আসা-যাওয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ। প্রতিদিন স্কুল-কলেজের শত শত শিক্ষার্থীসহ অসংখ্য মানুষকে এই পথ দিয়ে যাতায়াত করতে হয়।”

ব্রাহ্মণবাড়িয়া সরকারি কলেজের শিক্ষার্থী হাবিবুর রহমান বলেন, “একজন সুস্থ মানুষের পক্ষে এই বর্জ্যের স্তূপের পাশ দিয়ে স্বাভাবিকভাবে হেঁটে যাওয়াই কঠিন। সেখানে এই পরিবেশের মধ্যে বসবাস করা কতটা কষ্টকর, তা সহজেই বোঝা যায়। প্রতিদিন শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষকে দুর্গন্ধ সহ্য করে এই পথ দিয়ে চলাচল করতে হচ্ছে। দীর্ঘদিনের এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হওয়া প্রয়োজন।”

গোকর্ণঘাট এলাকার আমিনপুরের বাসিন্দা সিয়াম মিয়াও একই ধরনের দুর্ভোগের কথা জানিয়েছেন। তিনি বলেন, বর্ষা মৌসুমে বর্জ্য থেকে ছড়ানো উৎকট দুর্গন্ধে এলাকায় থাকা কঠিন হয়ে পড়ে। অন্যদিকে, শীতকালে বর্জ্য পোড়ানোর ধোঁয়ায় নাকাল হতে হয় স্থানীয় বাসিন্দাদের। তাঁর অভিযোগ, আশপাশের খালেও বর্জ্য ফেলা হচ্ছে। এতে খালের পানি দূষিত হওয়ার পাশাপাশি পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

স্থানীয়দের মতে, সমস্যাটি শুধু দুর্গন্ধের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। দীর্ঘদিন ধরে একই স্থানে বিপুল পরিমাণ বর্জ্য জমা হওয়া, সড়কের ওপর দূষিত পানি ছড়িয়ে পড়া এবং খালে বর্জ্য ফেলার অভিযোগ পুরো এলাকার পরিবেশগত পরিস্থিতিকে আরও উদ্বেগজনক করে তুলেছে। বিশেষ করে শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি, শিক্ষার্থী ও অসুস্থ মানুষের জন্য এমন পরিবেশ বাড়তি দুর্ভোগের কারণ হতে পারে। তাঁদের দাবি, শুধু বর্জ্য সংগ্রহ ও নির্দিষ্ট স্থানে ফেলার ব্যবস্থা করলেই হবে না; বর্জ্যের নিরাপদ ব্যবস্থাপনা, দূষণ নিয়ন্ত্রণ এবং বর্তমান ডাম্পিং স্টেশনের সমস্যা সমাধানে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।

এ বিষয়ে জেলা প্রশাসনের স্থানীয় সরকার বিভাগের উপপরিচালক ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া পৌরসভার প্রশাসক শরিফুল ইসলাম বলেন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সমস্যা সমাধানে নতুন জমি কেনার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এ জন্য দুই কোটি টাকা বাজেট ধরা হয়েছে। নতুন জমিতে যাওয়ার জন্য একটি রাস্তা নির্মাণ করে সেখানে বর্জ্য স্থানান্তরের পরিকল্পনাও রয়েছে।

তিনি বলেন, “আমরা শুধু একটি নতুন রাস্তা নির্মাণের পরিকল্পনা করছি না, এর সঙ্গে পরিবেশের সুরক্ষাকেও সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছি। বর্জ্যগুলোকে খেলার মাঠের আদলে সমতল করে ভেতরে রাখার একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।”

তবে নতুন জমি কেনা, রাস্তা নির্মাণ এবং বর্জ্য স্থানান্তরের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে কত সময় লাগবে, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট সময়সীমা জানা যায়নি। ফলে দীর্ঘদিনের এই দুর্ভোগ থেকে কবে মুক্তি মিলবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা থেকেই যাচ্ছে।

প্রায় দুই দশক ধরে চলা এই সংকটের অবসান চান ছয়বাড়িয়াবাসী। তাঁদের প্রত্যাশা, পরিকল্পনার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হবে। বর্জ্যের পাহাড় সরিয়ে পরিবেশবান্ধব বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা গেলে দুর্গন্ধ ও দূষণের দুর্ভোগ থেকে মুক্তি পাওয়ার পাশাপাশি স্বাভাবিক জীবনযাত্রাও ফিরে পেতে পারেন এলাকার বাসিন্দারা।

মন্তব্য

এখনো কেউ মন্তব্য করেননি। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।

আপনার মতামত লিখুন

০/২০০০