মূল লেখায় যান
শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর ২০২৬ · ৭ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
শিরোনাম
সারাবিশ্ব

পারমাফ্রস্ট গলে বিষাক্ত হচ্ছে পানি, নরওয়ের শহরে কলের পানি পানে নিষেধাজ্ঞা

বিশ্বের দ্রুত উষ্ণ হয়ে ওঠা অঞ্চলগুলোর অন্যতম নরওয়ের প্রত্যন্ত শহর লংইয়ারবিয়েনে কলের পানি পান না করার নির্দেশ জারি করা হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সারা বছর বরফে জমাট থাকা মাটি বা পারমাফ্রস্ট গলে যাওয়ায় শহরটির পানির উৎসে ভারী ধাতুর দূষণ ছড়িয়ে পড়ছে। এতে প্রায় ২ হাজার ৬০০ বাসিন্দার সুপেয়...

পারমাফ্রস্ট গলে বিষাক্ত হচ্ছে পানি, নরওয়ের শহরে কলের পানি পানে নিষেধাজ্ঞা

বিশ্বের দ্রুত উষ্ণ হয়ে ওঠা অঞ্চলগুলোর অন্যতম নরওয়ের প্রত্যন্ত শহর লংইয়ারবিয়েনে কলের পানি পান না করার নির্দেশ জারি করা হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সারা বছর বরফে জমাট থাকা মাটি বা পারমাফ্রস্ট গলে যাওয়ায় শহরটির পানির উৎসে ভারী ধাতুর দূষণ ছড়িয়ে পড়ছে। এতে প্রায় ২ হাজার ৬০০ বাসিন্দার সুপেয় পানির নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিজ্ঞানীদের আশঙ্কা, আর্কটিক অঞ্চলে তাপমাত্রা বৃদ্ধি অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে আরও অনেক জনবসতিতে একই ধরনের সংকট দেখা দিতে পারে।

নরওয়ের স্বালবার্ড দ্বীপপুঞ্জে অবস্থিত লংইয়ারবিয়েনের প্রধান পানির উৎস একটি হ্রদ। প্রায় ২ দশমিক ৫ কিলোমিটার দীর্ঘ বাঁধ দিয়ে হ্রদটির পানি আটকে রাখা হয়েছে। স্থানীয়ভাবে হ্রদটি ‘ইসডামেন’ নামে পরিচিত, যার অর্থ ‘বরফের পুকুর’। দীর্ঘদিন ধরে এই হ্রদ থেকেই শহরটির বাসিন্দাদের পানির চাহিদা পূরণ করা হচ্ছে। তবে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ায় আশপাশের জমাট মাটি গলছে। এতে মাটির নিচে চাপা পড়ে থাকা বিভিন্ন খনিজ ও শিলাস্তর উন্মুক্ত হয়ে পড়ছে এবং সেখান থেকে নির্গত ধাতু পানির উৎসে মিশে দূষণের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।

উত্তর মেরু থেকে প্রায় ৮০০ মাইল দূরে অবস্থিত এই শহরে বৈশ্বিক গড়ের তুলনায় পাঁচ থেকে সাত গুণ দ্রুত তাপমাত্রা বাড়ছে বলে জানিয়েছেন বিজ্ঞানীরা। বিশেষ করে শরৎকালে প্রতি দশকে তাপমাত্রা বৃদ্ধির হার ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত পৌঁছেছে। দ্রুত তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে পারমাফ্রস্টের স্থায়িত্ব কমে যাচ্ছে। এর প্রভাব শুধু ভূমির গঠনেই সীমাবদ্ধ থাকছে না; বরং পানির গুণগত মান ও স্থানীয় বাস্তুতন্ত্রের ওপরও পড়ছে।

গবেষকদের মতে, লংইয়ারবিয়েনের পানিতে ভারী ধাতুর দূষণের পেছনে প্রধানত দুটি কারণ রয়েছে। প্রথমটি হলো জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে পারমাফ্রস্ট গলে যাওয়া এবং দ্বিতীয়টি হলো শহরটির বিশেষ ভূতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য। একসময় খনিশিল্পের জন্য পরিচিত এই অঞ্চলের শিলাস্তরে এমন কিছু খনিজ রয়েছে, যেগুলো পানি ও অক্সিজেনের সংস্পর্শে এসে রাসায়নিক বিক্রিয়ার মাধ্যমে পানির গুণাগুণ পরিবর্তন করতে পারে।

স্বালবার্ড ইউনিভার্সিটি সেন্টারের আর্কটিক ভূতত্ত্বের সহযোগী অধ্যাপক ও পারমাফ্রস্ট বিশেষজ্ঞ মারজোলাইন ভেরেট বলেন, গলে যাওয়া পারমাফ্রস্ট এবং পাইরাইট নামের খনিজসমৃদ্ধ শেল শিলার সংমিশ্রণে পানির উৎস দূষিত হচ্ছে। পাইরাইটকে অনেক সময় ‘ফুলস গোল্ড’ বলা হয়। পানি ও অক্সিজেনের সংস্পর্শে এলে এই খনিজ জারিত হয়ে অম্লতা সৃষ্টি করতে পারে। ফলে উৎপন্ন অ্যাসিড শিলা থেকে বিভিন্ন ভারী ধাতু বের করে জলপ্রবাহে মিশিয়ে দেয়। লংইয়ারবিয়েনে মূলত ম্যাঙ্গানিজের আধিক্য নিয়ে সমস্যা দেখা দিয়েছে। তবে এ প্রক্রিয়ায় শিলা থেকে অন্যান্য দূষকও পানিতে মিশতে পারে বলে সতর্ক করেছেন বিজ্ঞানীরা।

গত বছরের সেপ্টেম্বরে লংইয়ারবিয়েনের পৌর কর্তৃপক্ষ প্রায় ২ হাজার ৬০০ বাসিন্দাকে পানির দূষণ সম্পর্কে প্রথম সতর্ক করে। পানিতে ম্যাঙ্গানিজের মাত্রা প্রতি লিটারে ৫০ মাইক্রোগ্রামের প্রস্তাবিত সীমার তুলনায় ২৫ গুণ বেশি পাওয়া যায়। নরওয়ের জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট পানীয় জলে ম্যাঙ্গানিজের এই সীমা নির্ধারণ করেছে। পরিস্থিতির ভয়াবহতা বিবেচনায় বাসিন্দাদের কলের পানি পান করা থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়।

শহরটির মেয়র টের্জে আউনেভিক জানান, হ্রদে পলি জমার কারণে পানির মান আগে থেকেই ভালো ছিল না। তবে ম্যাঙ্গানিজের মাত্রা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল, যা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। ফলে পরিস্থিতি মোকাবিলায় জরুরি ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হয়। পানির গুণগত মান নিয়ে উদ্বেগ বাড়তে থাকায় স্থানীয় প্রশাসন দূষণের উৎস শনাক্ত এবং নিরাপদ পানির বিকল্প ব্যবস্থা নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘ সময় ধরে অতিরিক্ত মাত্রার ম্যাঙ্গানিজের সংস্পর্শে থাকলে স্নায়ুতন্ত্রের ক্ষতি হতে পারে। শিশু ও নবজাতকদের ক্ষেত্রে এ ঝুঁকি বিশেষভাবে উদ্বেগজনক। এ কারণে পানিতে ভারী ধাতুর উপস্থিতি শনাক্ত হলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া এবং নিয়মিত পানির গুণগত মান পরীক্ষা করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

পরিস্থিতি সামাল দিতে স্থানীয় একটি ব্রুয়ারির সহায়তায় পরিশোধিত পানি সংরক্ষণের জন্য কেন্দ্রীয় ট্যাংক স্থাপন করা হয়েছে। সেখান থেকে বাসিন্দারা স্থানীয় সুপারমার্কেটে পাত্র নিয়ে গিয়ে বিনা মূল্যে পানি সংগ্রহ করতে পারছেন। একই সঙ্গে পানিদূষণের কারণ অনুসন্ধানে তদন্ত শুরু করা হয়। তবে পরবর্তী সময়ে পানিতে ম্যাঙ্গানিজের মাত্রা কমে এলেও সমস্যার পুরোপুরি সমাধান হয়নি।

চলতি বছরের শুরুর দিকে পানিতে সালফেট ও নিকেলের মাত্রাও পানীয় জলের জন্য সুপারিশকৃত সীমা ছাড়িয়ে যায়। ফলে কলের পানি পান না করার নিষেধাজ্ঞা এখনো বহাল রয়েছে। একাধিক দূষকের উপস্থিতি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। এতে শহরটির বাসিন্দাদের দৈনন্দিন জীবনে নিরাপদ পানির জন্য বিকল্প ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।

মেয়র টের্জে আউনেভিক বলেন, নরওয়েতে মানুষ দীর্ঘদিন ধরে কল খুলেই নিরাপদে পানি পান করার বিষয়ে অভ্যস্ত। কিন্তু এখন বাইরে থেকে পানি সংগ্রহ করে আনতে হচ্ছে, যা মেনে নেওয়া কঠিন। তাঁর মতে, অন্যান্য ছোট জনবসতিরও এ ধরনের পরিস্থিতি মোকাবিলায় আগাম প্রস্তুতি নেওয়া উচিত। নিজেদের পানির উৎসে দূষণ দেখা দিলে কীভাবে নিরাপদ পানি সরবরাহ নিশ্চিত করা হবে, তা আগে থেকেই পরিকল্পনা করে রাখা প্রয়োজন।

লংইয়ারবিয়েনের এই ঘটনা আর্কটিক অঞ্চলের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। মারজোলাইন ভেরেটসহ অন্যান্য বিজ্ঞানীর সতর্কবার্তা, অঞ্চলটির বিভিন্ন স্থানে পাইরাইট ও ভারী ধাতুসমৃদ্ধ শিলা রয়েছে। একই সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সেখানে পারমাফ্রস্টও দ্রুত গলছে। ফলে লংইয়ারবিয়েনের মতো পানিদূষণের ঘটনা অন্য এলাকাতেও ঘটতে পারে।

বিজ্ঞানীদের আশঙ্কা, উত্তর কানাডা ও আলাস্কার মতো অঞ্চলেও তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে একই ধরনের সংকট তৈরি হতে পারে। পারমাফ্রস্ট গলে যাওয়ার ফলে ভূগর্ভস্থ খনিজ পদার্থ পানির উৎসে মিশে গেলে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সুপেয় পানির সরবরাহ হুমকির মুখে পড়তে পারে। তাই জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় শুধু তাপমাত্রা ও বরফ গলার বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করলেই হবে না; পাশাপাশি পানির উৎসের রাসায়নিক গুণাগুণ নিয়মিত পরীক্ষা এবং নিরাপদ পানির দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থা নিশ্চিত করাও জরুরি।

মন্তব্য

এখনো কেউ মন্তব্য করেননি। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।

আপনার মতামত লিখুন

০/২০০০