মূল লেখায় যান
শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর ২০২৬ · ৭ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
শিরোনাম
সারাবিশ্ব

সমুদ্রের ১০ মিটার গভীরে ডাকবাক্স, দুই দশকে জমা পড়েছে প্রায় ৩৮ হাজার চিঠি

চিঠি পাঠাতে সাধারণত ডাকঘর কিংবা রাস্তার পাশের ডাকবাক্সের দ্বারস্থ হতে হয়। কিন্তু জাপানে রয়েছে এমন এক ব্যতিক্রমী ডাকবাক্স, যেখানে চিঠি পাঠাতে হলে নামতে হয় সমুদ্রের তলদেশে। দেশটির ওয়াকায়ামা প্রদেশের সুসামি উপসাগরে সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১০ মিটার (৩৩ ফুট) গভীরে স্থাপন করা হয়েছে এই ডাকবাক্স। বিশেষ পানিরোধী পোস্টকার্ডে বার্তা...

সমুদ্রের ১০ মিটার গভীরে ডাকবাক্স, দুই দশকে জমা পড়েছে প্রায় ৩৮ হাজার চিঠি

চিঠি পাঠাতে সাধারণত ডাকঘর কিংবা রাস্তার পাশের ডাকবাক্সের দ্বারস্থ হতে হয়। কিন্তু জাপানে রয়েছে এমন এক ব্যতিক্রমী ডাকবাক্স, যেখানে চিঠি পাঠাতে হলে নামতে হয় সমুদ্রের তলদেশে। দেশটির ওয়াকায়ামা প্রদেশের সুসামি উপসাগরে সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১০ মিটার (৩৩ ফুট) গভীরে স্থাপন করা হয়েছে এই ডাকবাক্স। বিশেষ পানিরোধী পোস্টকার্ডে বার্তা লিখে স্কুবা ডাইভিংয়ের মাধ্যমে সেখানে পৌঁছে চিঠি জমা দেন ডুবুরিরা। অভিনব এই উদ্যোগ পর্যটকদের কাছে যেমন আকর্ষণীয়, তেমনি স্থানীয় জনপদটির পরিচিতি বাড়াতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

১৯৯৯ সালে পর্যটকদের আকৃষ্ট করার উদ্দেশ্যে চালু করা হয় এই পানির নিচের ডাকবাক্স। শুরুর দিকে এটি ছিল স্থানীয় পর্যটনকে জনপ্রিয় করার একটি সৃজনশীল উদ্যোগ। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ব্যতিক্রমী এই ডাকব্যবস্থার কথা ছড়িয়ে পড়ে জাপানের গণ্ডি পেরিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে। ২০০২ সালে ডাকবাক্সটি বিশ্বের সবচেয়ে গভীরে অবস্থিত ডাকবাক্স হিসেবে গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসে স্বীকৃতি পায়। এর ফলে সুসামি উপসাগর আন্তর্জাতিক পর্যটকদের কাছেও বিশেষ আকর্ষণের কেন্দ্র হয়ে ওঠে।

জাপানের কিই উপদ্বীপের ছোট মাছধরা জনপদ সুসামিতে নব্বইয়ের দশকের শেষ দিকে পর্যটকদের আগমন বাড়ানোর নতুন উপায় খুঁজছিলেন স্থানীয় কর্তৃপক্ষ। সে সময় এলাকার ডাকঘরপ্রধান তোশিহিকো মাতসুমোতো সমুদ্রের তলদেশে একটি কার্যকর ডাকবাক্স স্থাপনের প্রস্তাব দেন। ডাক বিভাগে প্রায় ৪০ বছর কাজ করার অভিজ্ঞতা থেকে তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, প্রচলিত ব্যবস্থার বাইরে ব্যতিক্রমী কোনো উদ্যোগ পর্যটকদের সহজেই আকৃষ্ট করতে পারে। তাঁর ধারণা ছিল, পানির নিচে চিঠি পাঠানোর সুযোগ তৈরি করা গেলে ডুবুরি ও ভ্রমণপ্রেমীরা সুসামিতে আসতে আগ্রহী হবেন।

মাতসুমোতোর পরিকল্পনা বাস্তবায়নে এগিয়ে আসে স্থানীয় একটি ডাইভিং প্রতিষ্ঠান। ১৯৯৯ সালে তাদের সহায়তায় সুসামি উপসাগরের তলদেশে স্থাপন করা হয় লাল রঙের একটি ঢালাই লোহার ডাকবাক্স। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১০ মিটার গভীরে বসানো বাক্সটি জাপানের প্রচলিত ডাকব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করা হয়। ফলে এটি কেবল পর্যটকদের দেখার জন্য তৈরি কোনো প্রদর্শনীতে সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং এর মাধ্যমে পাঠানো পোস্টকার্ডও নিয়মিত ডাকব্যবস্থার আওতায় গন্তব্যে পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়।

তবে সমুদ্রের নিচে চিঠি পাঠানোর জন্য ব্যবহার করতে হয় বিশেষ ধরনের পোস্টকার্ড। পানির সংস্পর্শে সাধারণ কাগজের পোস্টকার্ড নষ্ট হয়ে যেতে পারে বলে এখানে ব্যবহার করা হয় পানিরোধী প্লাস্টিকের কার্ড। স্থানীয় ডাইভিং দোকান থেকে এসব পোস্টকার্ড সংগ্রহ করেন আগ্রহীরা। এরপর তেলভিত্তিক মার্কার দিয়ে পানিতে নামার আগেই কার্ডে নিজেদের বার্তা ও প্রাপকের ঠিকানা লিখে নেন তাঁরা। সব প্রস্তুতি শেষ হলে স্কুবা ডাইভিং সরঞ্জাম নিয়ে সমুদ্রের তলদেশে নেমে পোস্টকার্ডটি ডাকবাক্সে জমা দেন।

এই অভিজ্ঞতা সাধারণ ডাকবাক্সে চিঠি ফেলার চেয়ে অনেকটাই আলাদা। এখানে চিঠি পাঠানোর জন্য শুধু বার্তা লিখলেই হয় না; প্রয়োজন হয় ডাইভিংয়ের প্রস্তুতি, উপযুক্ত সরঞ্জাম এবং পানির নিচে নিরাপদে চলাচলের সক্ষমতা। এ কারণে ডাকবাক্সটি বিশেষ করে স্কুবা ডাইভারদের কাছে বাড়তি আকর্ষণ তৈরি করেছে। অনেকের কাছে এটি শুধু চিঠি পাঠানোর মাধ্যম নয়, বরং সমুদ্রের নিচে একটি স্মরণীয় অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ।

ডাকবাক্সে জমা পড়া পোস্টকার্ড সংগ্রহের ব্যবস্থাটিও বেশ ব্যতিক্রমী। এটি প্রতিদিন খোলা হয় না। নির্ধারিত ব্যবস্থার আওতায় সংশ্লিষ্ট কর্মীরা বিশেষ চাবি দিয়ে বাক্সটি খুলে পোস্টকার্ড সংগ্রহ করেন। স্থানীয় ডাইভিং প্রতিষ্ঠানের কর্মীরা সমুদ্রের তলদেশে ডুব দিয়ে কার্ডগুলো তুলে আনেন এবং সেগুলো সুসামি ডাকঘরে পৌঁছে দেন। এরপর অন্যান্য ডাকের মতোই পোস্টকার্ডগুলো নির্দিষ্ট ঠিকানায় পাঠানো হয়। অর্থাৎ, সমুদ্রের তলদেশে জমা দেওয়া হলেও চিঠিগুলো শেষ পর্যন্ত জাপানের নিয়মিত ডাকব্যবস্থার মাধ্যমেই প্রাপকের কাছে পৌঁছায়।

সমুদ্রের নোনা পানির মধ্যে দীর্ঘদিন লোহার ডাকবাক্স টিকিয়ে রাখাও একটি বড় চ্যালেঞ্জ। লবণাক্ত পানির কারণে বাক্সে মরিচা ধরে এবং ধাতব অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। এ সমস্যা মোকাবিলায় ডাকবাক্সটির নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ, মেরামত ও রং করার প্রয়োজন হয়। এ জন্য দুটি ডাকবাক্স পর্যায়ক্রমে ব্যবহার করা হয়। একটি বাক্স মেরামতের জন্য তুলে নেওয়া হলে অন্যটি দিয়ে ডাক সংগ্রহের কাজ চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়। ফলে রক্ষণাবেক্ষণের প্রয়োজন হলেও ব্যতিক্রমী এই ডাকসেবা সচল রাখা যায়।

প্রথম দিকে স্থানীয় পর্যটন উৎসবকে কেন্দ্র করে চালু হওয়া উদ্যোগটি ধীরে ধীরে নিজস্ব পরিচিতি তৈরি করে। বিশেষ করে গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসে স্বীকৃতি পাওয়ার পর সুসামির পানির নিচের ডাকবাক্সের প্রতি মানুষের আগ্রহ বাড়তে থাকে। বিভিন্ন দেশের ডুবুরি, পর্যটক ও ভ্রমণপ্রেমীরা সেখানে গিয়ে সমুদ্রের তলদেশ থেকে পোস্টকার্ড পাঠানোর অভিজ্ঞতা নিতে শুরু করেন। অভিনব এই আয়োজন স্থানীয় পর্যটনশিল্পের জন্যও নতুন সম্ভাবনা তৈরি করে।

২০১৮ সালে নির্মিত একটি প্রামাণ্যচিত্রে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ডাকবাক্সটি স্থাপনের পর থেকে তত দিনে এর মাধ্যমে প্রায় ৩৮ হাজার পানিরোধী পোস্টকার্ড পাঠানো হয়েছিল। অর্থাৎ, প্রায় দুই দশকে হাজারো মানুষ সমুদ্রের তলদেশে নেমে তাঁদের প্রিয়জনদের কাছে বার্তা পাঠিয়েছেন। সাধারণ ডাকব্যবস্থার সঙ্গে ভিন্নধর্মী অভিজ্ঞতার সমন্বয়ই এই উদ্যোগকে দীর্ঘদিন ধরে জনপ্রিয় রাখতে সাহায্য করেছে।

এই উদ্যোগের পেছনে থাকা তোশিহিকো মাতসুমোতো এর জনপ্রিয়তা পুরোপুরি দেখে যেতে পারেননি বলে সংশ্লিষ্টদের বর্ণনায় উঠে এসেছে। তবে স্থানীয় ডাইভিং প্রতিষ্ঠানের কর্মীরা এখনো তাঁর পরিকল্পনাকে সুসামির পরিচিতি গড়ে তোলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হিসেবে বিবেচনা করেন। বড় ধরনের প্রচারণার ওপর নির্ভর না করে মানুষের অভিজ্ঞতা, মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়া গল্প এবং আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির মাধ্যমে ডাকবাক্সটি পরিচিতি পেয়েছে।

সুসামির এই পানির নিচের ডাকবাক্স প্রমাণ করে, পর্যটকদের আকৃষ্ট করতে সব সময় বিশাল অবকাঠামো কিংবা ব্যয়বহুল আয়োজনের প্রয়োজন হয় না। কখনো কখনো একটি ছোট, ব্যতিক্রমী ও কার্যকর ধারণাই কোনো জনপদকে বিশ্বের মানুষের কাছে পরিচিত করে তুলতে পারে। সমুদ্রের তলদেশে বসানো লাল রঙের এই ডাকবাক্স তাই শুধু চিঠি আদান-প্রদানের মাধ্যম নয়; এটি সৃজনশীল চিন্তা, স্থানীয় উদ্যোগ এবং ভ্রমণকারীদের স্মরণীয় অভিজ্ঞতার এক অনন্য উদাহরণ।

মন্তব্য

এখনো কেউ মন্তব্য করেননি। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।

আপনার মতামত লিখুন

০/২০০০