মূল লেখায় যান
শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর ২০২৬ · ৭ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
শিরোনাম
সারাবিশ্ব

সৌদি আরবে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা নিয়ে উত্তেজনা, ৮৫ সেনাকে আটকের দাবি হুতিদের

সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদ ও খামিস মুশাইত লক্ষ্য করে ছোড়া তিনটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করার দাবি করেছে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট। অন্যদিকে, বাব আল-মান্দেব প্রণালির আশপাশে সংঘর্ষের পর সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের ৮৫ সেনাকে আটকের দাবি করেছে ইয়েমেনের হুতি গোষ্ঠী। আটক ব্যক্তিদের মধ্যে ৪৭ জন পাকিস্তানি সেনা রয়েছেন বলে দাবি...

সৌদি আরবে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা নিয়ে উত্তেজনা, ৮৫ সেনাকে আটকের দাবি হুতিদের

সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদ ও খামিস মুশাইত লক্ষ্য করে ছোড়া তিনটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করার দাবি করেছে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট। অন্যদিকে, বাব আল-মান্দেব প্রণালির আশপাশে সংঘর্ষের পর সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের ৮৫ সেনাকে আটকের দাবি করেছে ইয়েমেনের হুতি গোষ্ঠী। আটক ব্যক্তিদের মধ্যে ৪৭ জন পাকিস্তানি সেনা রয়েছেন বলে দাবি করেছেন গোষ্ঠীটির সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি। তবে এসব দাবির বিষয়ে স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বিবৃতিতে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের মুখপাত্র তুর্কি আল-মালিকি জানান, রিয়াদ লক্ষ্য করে একটি এবং খামিস মুশাইত লক্ষ্য করে দুটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়েছিল। জোটের দাবি, আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার মাধ্যমে তিনটি ক্ষেপণাস্ত্রই শনাক্ত করে আকাশে ধ্বংস করা হয়েছে।
সোমবার রাতে রিয়াদের বাসিন্দারা কয়েকটি শক্তিশালী বিস্ফোরণের শব্দ শুনতে পান। এর কিছুক্ষণ আগে তাঁদের মুঠোফোনে সম্ভাব্য আকাশপথের হামলা সম্পর্কে সতর্কবার্তা পাঠানো হয়। হুতি গোষ্ঠীর দাবি, রিয়াদে তাদের লক্ষ্যবস্তু ছিল কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। এ ছাড়া খামিস মুশাইতের একটি সামরিক বিমানঘাঁটি লক্ষ্য করে ড্রোন পাঠানোর কথাও জানিয়েছেন ইয়াহিয়া সারি। সৌদি আরবের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে অবস্থিত খামিস মুশাইত ইয়েমেন সীমান্তের কাছাকাছি একটি গুরুত্বপূর্ণ শহর।
সৌদি আরবের বিমানবন্দরগুলোকে হুতিদের সতর্কবার্তা
সৌদি আরবের বিভিন্ন বিমানবন্দরে ফ্লাইট পরিচালনা ও যাতায়াতের বিষয়ে আন্তর্জাতিক বিমান সংস্থা এবং যাত্রীদের সতর্ক করেছেন হুতিদের সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি। তাঁর ভাষ্য, মক্কা ও মদিনার বিমানবন্দর ছাড়া দেশটির অন্যান্য বিমানবন্দর বর্তমানে অনিরাপদ। তবে হুতিদের এ দাবির স্বাধীন কোনো নিশ্চয়তা পাওয়া যায়নি।
নতুন করে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ঘটনা এমন এক সময়ে ঘটল, যখন এর আগে হুতিদের হামলার পর থেকে রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্যক্রম বন্ধ থাকার খবর পাওয়া গেছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, শনিবারের হামলায় অন্তত ১৩ জন নিহত এবং তিন শতাধিক মানুষ আহত হন। পরদিন রোববারের আরেকটি হামলায় একজন নিহত ও ১১ জন আহত হন।
সৌদি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বিমানবন্দরটি আগামী শনিবার পর্যন্ত বন্ধ থাকবে। নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতির কারণে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বিমান সংস্থা রিয়াদগামী এবং রিয়াদ থেকে ছেড়ে যাওয়া ফ্লাইট বাতিল করেছে। এ ছাড়া সৌদি আরবের তেল স্থাপনাগুলোতেও হামলা চালানোর দাবি করেছে হুতিরা।
ইয়েমেনের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দেশটির আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের সমর্থক বাহিনীর সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে সংঘাতে জড়িয়ে রয়েছে হুতি গোষ্ঠী। অন্যদিকে, সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট হুতিদের অবস্থান লক্ষ্য করে বিমান হামলা চালানোর পাশাপাশি ইয়েমেনের সরকারি বাহিনীকে সমর্থন দিয়ে আসছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধকে কেন্দ্র করে মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা বাড়ার মধ্যে ইয়েমেনের সংঘাতও নতুন করে তীব্র হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
সংকট মোকাবিলার সক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগ
রিয়াদে একটি জ্বালানি সম্মেলনে বক্তব্য দিতে গিয়ে সৌদি আরবের জ্বালানিমন্ত্রী প্রিন্স আবদুল আজিজ বিন সালমান আল সৌদ বলেন, গত এক সপ্তাহে দেশটির বিমানবন্দরগুলোতে হামলার ঘটনা সৌদি আরবের সংকট মোকাবিলার সক্ষমতার জন্য বড় পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তিনি বলেন, সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোর ঘটনাগুলো গুরুতর এবং এর জবাবে সমান গুরুত্ব দিয়ে পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের ঘোষিত ‘ভিশন ২০৩০’ পরিকল্পনা বাস্তবায়ন অব্যাহত রাখার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। এ পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য দেশটির অর্থনীতিকে বহুমুখী করা এবং তেলের ওপর নির্ভরতা কমানো। এ প্রসঙ্গে জ্বালানিমন্ত্রী বিনিয়োগ অব্যাহত রাখার প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন।
এদিকে, ধারাবাহিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা প্রতিহত করতে সৌদি আরবের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে তদন্ত শুরু করেছে দেশটির কর্তৃপক্ষ। বার্তা সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে (এপি) এ তথ্য জানিয়েছেন মধ্যপ্রাচ্যের দুই কর্মকর্তা। তাঁরা নাম প্রকাশ না করার শর্তে কথা বলেছেন।
কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রাথমিক তদন্তে ধারণা করা হচ্ছে, হুতিরা প্রথমে কয়েকটি ড্রোন পাঠিয়ে সৌদি আরবের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থাকে ব্যস্ত রাখার চেষ্টা করে। এরপর ক্রুজ ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের একটি বহর ছোড়া হয়। এর মধ্যে কয়েকটি ক্ষেপণাস্ত্র শেষ পর্যন্ত বিমানবন্দর পর্যন্ত পৌঁছে যায় বলে তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।
তদন্তে আরও উঠে এসেছে, হুতিদের হাতে এমন কিছু ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে, যেগুলোর বিস্ফোরকবাহী অংশ উড্ডয়নের সময় গতিপথ পরিবর্তন করতে পারে। এ ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করা আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার জন্য কঠিন চ্যালেঞ্জ। সৌদি আরব ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধে প্যাট্রিয়টসহ বিভিন্ন প্রতিরক্ষাব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল।
এপিকে এক কর্মকর্তা জানান, হামলার বিষয়ে আগাম সতর্কবার্তা দেওয়া সম্ভব হয়নি কেন, সেটিও তদন্ত করা হচ্ছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনগুলো এক হাজার কিলোমিটারের বেশি দূরত্ব অতিক্রম করে রিয়াদে পৌঁছেছিল। এত দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে আসার পরও কেন সৌদি প্রতিরক্ষাব্যবস্থা আগে সতর্কসংকেত দিতে পারেনি, তা খতিয়ে দেখছেন তদন্তকারীরা।
যুক্তরাষ্ট্রকে পাল্টা হামলার হুঁশিয়ারি হুতিদের
হুতি গোষ্ঠীর কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে গোষ্ঠীটির বিরুদ্ধে ওয়াশিংটন কী ধরনের পদক্ষেপ নেবে, সে বিষয়ে তিনি স্পষ্ট করে কিছু জানাননি।
হুতিদের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের পরবর্তী পদক্ষেপ সম্পর্কে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প বলেন, গোষ্ঠীটি খুব খারাপ আচরণ করছে এবং বিষয়টি মোটেও ভালো নয়।
অন্যদিকে, ইয়েমেনে যুক্তরাষ্ট্র সামরিক হস্তক্ষেপ করলে পাল্টা হামলা চালানোর হুঁশিয়ারি দিয়েছেন হুতিদের রাজনৈতিক শাখার সদস্য মোহাম্মদ আল-বুখাইতি। বার্তা সংস্থা এএফপিকে দেওয়া এক বক্তব্যে তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ইয়েমেনের বিরুদ্ধে সামরিক আগ্রাসনে অংশ নিলে পাল্টা জবাব দিতে তারা দেরি করবে না। বরং যুক্তরাষ্ট্র এবং এ অঞ্চলে দেশটির স্বার্থসংশ্লিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে দ্রুত ও কঠোর হামলা চালানো হবে।
সৌদি আরবের তেল স্থাপনা ও বিমানবন্দরে কর্মরত ব্যক্তিদেরও সতর্ক করেছেন আল-বুখাইতি। তাঁর দাবি, এসব স্থাপনা এখন হুতিদের কাছে বৈধ লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে। এ কারণে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের স্থাপনাগুলো থেকে দূরে থাকার আহ্বান জানান তিনি।
বিনিয়োগ সম্মেলন ও ফ্লাইট সূচিতেও প্রভাব
সৌদি আরবের নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতিতে চলতি মাসে রিয়াদে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা থাকা কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ আয়োজন নিয়েও অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে দেশটির গুরুত্বপূর্ণ বিনিয়োগ সম্মেলন ও বিশ্ব জ্বালানি কংগ্রেস। এ ছাড়া এসব আয়োজনের কর্মসূচি থেকে কয়েকজন শীর্ষস্থানীয় তেল নির্বাহীর নাম বাদ দেওয়া হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের জাতীয় বিমান সংস্থা ইতিহাদ এয়ারওয়েজ জানিয়েছে, নিরাপত্তা পরিস্থিতির কারণে আগামী সপ্তাহ পর্যন্ত রিয়াদগামী এবং রিয়াদ থেকে ছেড়ে যাওয়া সব ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে। একই সঙ্গে দাম্মাম ও জেদ্দাগামী ফ্লাইটও স্থগিত করেছে সংস্থাটি।
বাহরাইনের জাতীয় বিমান সংস্থা গালফ এয়ার জানিয়েছে, আগামী শনিবার পর্যন্ত রিয়াদের সব ফ্লাইট বাতিল থাকবে। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের বিমান সংস্থা ডেল্টা আটলান্টা থেকে রিয়াদে সরাসরি ফ্লাইট চালুর সময় পিছিয়ে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। আগামী ২৩ অক্টোবর থেকে ফ্লাইটটি চালুর পরিকল্পনা ছিল।
ক্রমাগত ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা, বিমানবন্দরের কার্যক্রমে বিঘ্ন এবং আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে তদন্ত-সব মিলিয়ে সৌদি আরবের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বিমান চলাচল, বিনিয়োগ আয়োজন এবং মধ্যপ্রাচ্যের আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার ওপরও এর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

মন্তব্য

এখনো কেউ মন্তব্য করেননি। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।

আপনার মতামত লিখুন

০/২০০০