সৌদি আরবের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে সামরিক সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে তুরস্ক ও পাকিস্তান। তবে এই সহযোগিতার অংশ হিসেবে ইরান বা ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে সরাসরি সামরিক হামলায় অংশ নেবে না দেশ দুটি। এদিকে সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে স্বাক্ষরিত একটি যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তির অনুমোদনের জন্য তুরস্ক সরকার সংসদে প্রস্তাব পাঠিয়েছে।
‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’ নামে পরিচিত এই চুক্তিতে ন্যাটোর পারস্পরিক প্রতিরক্ষার নীতির আদলে একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারা রাখা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, চুক্তিভুক্ত তিন দেশের যেকোনো একটির ওপর সশস্ত্র হামলা হলে সেটিকে তিনটি দেশের ওপরই হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে। এর ফলে কোনো একটি দেশ আক্রান্ত হলে অন্য দুই দেশও তার প্রতিরক্ষায় সহযোগিতা করার বাধ্যবাধকতার আওতায় আসবে।
গত আগস্টে সৌদি আরবের মক্কা শহরে চুক্তিটিতে স্বাক্ষর করেন সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান, তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোয়ান এবং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ। আঞ্চলিক নিরাপত্তা জোরদার, সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং পারস্পরিক প্রতিরক্ষা সহযোগিতা সম্প্রসারণের লক্ষ্যেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। চুক্তির মাধ্যমে তেলসমৃদ্ধ সৌদি আরব, পারমাণবিক অস্ত্রধারী পাকিস্তান এবং ন্যাটোর দ্বিতীয় বৃহত্তম সেনাবাহিনীর অধিকারী তুরস্কের মধ্যে কৌশলগত সম্পর্ক আরও গভীর হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
সৌদি আরবের প্রতিরক্ষা জোরদারে তুরস্ক সামরিক সহায়তা পাঠানোর বিষয়টি বিবেচনা করছে। তবে তুর্কি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এই চুক্তির মূল উদ্দেশ্য প্রতিরক্ষামূলক সহযোগিতা নিশ্চিত করা। ইয়েমেনে যুদ্ধ পরিচালনা কিংবা হুথি বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে সরাসরি হামলা চালানোর জন্য তুরস্কের সেনা মোতায়েনের পরিকল্পনা নেই। একইভাবে তুরস্ক ও পাকিস্তানের কর্মকর্তারা জোর দিয়ে বলেছেন, এই প্রতিরক্ষা চুক্তি ইরান কিংবা অন্য কোনো নির্দিষ্ট দেশের বিরুদ্ধে পরিচালিত নয়। তবে ইরানের পক্ষ থেকে কোনো হামলা হলে পরিস্থিতি কীভাবে মোকাবিলা করা হবে, সে বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানানো হয়নি।
চলতি মাসের শুরুতে সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে অনুষ্ঠিত এক জরুরি বৈঠকে তিন দেশ যৌথ প্রতিরক্ষা প্রতিশ্রুতি দ্রুত কার্যকর করার বিষয়ে একমত হয়। এর আওতায় প্রয়োজন হলে সৌদি আরবে দ্রুত সামরিক বাহিনী মোতায়েনের বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। পাশাপাশি আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ানোর বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়ে আলোচনা চলছে।
তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান জানিয়েছেন, সৌদি আরবকে সম্ভাব্য আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, ইলেকট্রনিক যুদ্ধ পরিচালনার সক্ষমতা এবং প্রযুক্তিগত সহায়তা দেওয়ার বিষয়টি তুরস্ক ও পাকিস্তান মূল্যায়ন করছে। এসব সহায়তা বাস্তবায়িত হলে সৌদি আরবের আকাশসীমা সুরক্ষা এবং সম্ভাব্য ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা মোকাবিলার সক্ষমতা বাড়তে পারে।
১৬ অনুচ্ছেদবিশিষ্ট এই চুক্তিতে জাতিসংঘ সনদে স্বীকৃত আত্মরক্ষার অধিকার অনুসারে বাইরের কোনো সশস্ত্র হামলার মুখে চুক্তিভুক্ত দেশগুলোর পারস্পরিক সামরিক সহযোগিতার কথা বলা হয়েছে। শুধু জরুরি পরিস্থিতিতে প্রতিরক্ষা সহায়তাই নয়, চুক্তিতে যৌথ সামরিক প্রশিক্ষণ, মহড়া, সামরিক কর্মকর্তা ও কর্মী বিনিময়, অস্ত্র উৎপাদনে সহযোগিতা, প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়ের মতো বিষয়ও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
চুক্তিটির আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো এর মেয়াদ ও প্রত্যাহারসংক্রান্ত শর্ত। এতে বলা হয়েছে, স্বাক্ষরকারী দেশগুলো প্রথম ১০ বছরের মধ্যে চুক্তি থেকে সরে যেতে পারবে না। ১০ বছর পর কোনো দেশ চুক্তি থেকে প্রত্যাহার করতে চাইলে অন্তত তিন মাস আগে আনুষ্ঠানিক নোটিশ দিতে হবে। ফলে দীর্ঘমেয়াদে তিন দেশের মধ্যে সামরিক ও কৌশলগত সহযোগিতা বজায় রাখার একটি কাঠামো তৈরি হয়েছে।
বিশ্লেষকদের দৃষ্টিতে, এই প্রতিরক্ষা উদ্যোগ মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনৈতিক সমীকরণে নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে। তবে সৌদি আরবের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সামরিক সহযোগিতা জোরদার করা হলেও ইরান বা হুথিদের বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার বিষয়ে তুরস্ক ও পাকিস্তানের সতর্ক অবস্থান আঞ্চলিক উত্তেজনা নিয়ন্ত্রণের প্রচেষ্টার ইঙ্গিত দেয়। চুক্তিটি বাস্তবে কীভাবে কার্যকর হবে এবং সম্ভাব্য আঞ্চলিক সংঘাতের ক্ষেত্রে তিন দেশ কী ধরনের পদক্ষেপ নেবে, তা এখনো গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হিসেবে রয়ে গেছে।









মন্তব্য
এখনো কেউ মন্তব্য করেননি। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।