চীনা প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠান ডিপসিকের তৈরি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তি ব্যবহারের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে যুক্তরাষ্ট্র সরকার। দেশটির অধিকাংশ বেসামরিক সরকারি সংস্থায় ডিপসিকের এআই প্রযুক্তি ব্যবহার নিষিদ্ধ করার পাশাপাশি এই মডেল ব্যবহার করে তৈরি বিভিন্ন প্রযুক্তি ও সেবাও সরকারি ব্যবস্থাপনা থেকে সরিয়ে ফেলার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। জাতীয় নিরাপত্তা ও তথ্য সুরক্ষা নিয়ে উদ্বেগের প্রেক্ষাপটে এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগ (ডিএইচএস) জানিয়েছে, বেসামরিক সরকারি সংস্থাগুলোতে ডিপসিকের কোনো প্রযুক্তি ব্যবহার করা যাবে না। একই সঙ্গে ডিপসিকের এআই মডেলনির্ভর প্রযুক্তিও সংশ্লিষ্ট সরকারি ব্যবস্থাগুলো থেকে সরিয়ে ফেলতে হবে। তবে প্রতিরক্ষা বিভাগের অধীন সংস্থাগুলো এই নিষেধাজ্ঞার আওতামুক্ত থাকবে। ফলে নিষেধাজ্ঞাটি মূলত দেশটির বিভিন্ন বেসামরিক সরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রযুক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, সোমবার এ-সংক্রান্ত নির্দেশনা প্রকাশ করা হলেও নিষেধাজ্ঞাটি কার্যকর হয়েছে জুলাই মাসের শেষ দিকে। মার্কিন অর্থ বিভাগ, পররাষ্ট্র দপ্তর ও বিচার বিভাগের মতো গুরুত্বপূর্ণ বেসামরিক সরকারি সংস্থাগুলোও এই নির্দেশনার আওতায় রয়েছে। তবে ডিপসিকের প্রযুক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রে ঠিক কী ধরনের নিরাপত্তাঝুঁকি চিহ্নিত করা হয়েছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করেনি ডিএইচএস।
এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে যুক্তরাষ্ট্রের হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগ, ডিপসিক এবং ওয়াশিংটনে অবস্থিত চীনা দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বক্তব্য পাওয়া গেছে কি না, সে বিষয়ে বিস্তারিত জানানো হয়নি।
চীনা এআই প্রযুক্তি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বেগ নতুন নয়। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন চীনের প্রযুক্তিগত অগ্রগতিকে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র হিসেবে বিবেচনা করছে। চলতি বছরের শুরুর দিকে হোয়াইট হাউসের প্রযুক্তিবিষয়ক প্রধান মাইকেল ক্র্যাটসিওস এক অভ্যন্তরীণ স্মারকে অভিযোগ করেন, চীনের প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিষ্ঠানগুলো মার্কিন এআই কোম্পানিগুলোর প্রযুক্তির অপব্যবহার করছে। এ ধরনের অভিযোগ দুই দেশের মধ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতা নিয়ে উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে।
এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের এআই প্রতিষ্ঠান অ্যানথ্রপিক ও ওপেনএআইয়ের পক্ষ থেকেও ডিপসিকসহ চীনের কয়েকটি এআই প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে তাদের মডেলের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা নকল করার অভিযোগ তোলা হয়েছে। এসব অভিযোগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতিযোগিতা, মডেল প্রশিক্ষণ এবং বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদের সুরক্ষার বিষয়গুলোও জড়িত। তবে অভিযোগগুলোকে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর বক্তব্য হিসেবে বিবেচনা করতে হবে; এগুলোকে প্রমাণিত সত্য হিসেবে ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এর আগে বিভিন্ন বক্তব্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার উন্নয়নকে যুক্তরাষ্ট্রের ভবিষ্যতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেছেন। তাঁর প্রশাসনের কাছে এআই প্রযুক্তিতে নেতৃত্ব ধরে রাখা একটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য। অন্যদিকে, চীনা প্রতিষ্ঠানগুলোর দ্রুত অগ্রগতি যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি খাতে প্রতিযোগিতা আরও বাড়িয়ে তুলেছে। ডিপসিকের ওপর সরকারি নিষেধাজ্ঞাকে এই বৃহত্তর প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতার প্রেক্ষাপটেই দেখা হচ্ছে।
২০২৫ সালে বিশ্বজুড়ে আলোচনায় আসার পর থেকে ডিপসিকের জনপ্রিয়তা দ্রুত বৃদ্ধি পায়। প্রতিষ্ঠানটির এআই মডেল ব্যবহারের চাহিদা এতটাই বেড়েছিল যে কয়েক দফায় তাদের সার্ভারে সমস্যা দেখা দেয়। ডিপসিকের বিনা মূল্যের চ্যাটবটও অ্যাপল অ্যাপ স্টোরে সর্বাধিক ডাউনলোড করা অ্যাপগুলোর মধ্যে জায়গা করে নেয়। এর ফলে প্রযুক্তি খাতের বাইরেও সাধারণ ব্যবহারকারীদের মধ্যে চীনা এই এআই প্রযুক্তি পরিচিতি লাভ করে।
শুধু ব্যক্তিগত ব্যবহার নয়, বিভিন্ন প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠানও নিজেদের সেবায় ডিপসিকের মডেল যুক্ত করেছে। স্নোফ্লেক, ভারসেল ও ওপেনরাউটারের মতো প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন প্রযুক্তিসেবা ও এআই ব্যবহারের পরিসরে এই মডেল ব্যবহারের সুযোগ দিয়েছে। ফলে ডিপসিকের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি নিষেধাজ্ঞা দেশটির সরকারি প্রযুক্তি ব্যবস্থাপনায় প্রভাব ফেললেও বেসরকারি খাতে এর ব্যবহার কীভাবে প্রভাবিত হবে, তা নির্ভর করবে সংশ্লিষ্ট নীতিমালা ও প্রতিষ্ঠানের সিদ্ধান্তের ওপর।
ডিপসিকের জনপ্রিয়তার অন্যতম কারণ এর তুলনামূলক কম খরচ এবং উন্মুক্ত মডেল ব্যবহারের সুযোগ। উন্মুক্ত উৎস বা ওপেন-ওয়েট মডেল ব্যবহার করে প্রযুক্তি নির্মাতারা নিজেদের প্রয়োজন অনুযায়ী বিভিন্ন এআইভিত্তিক সেবা তৈরি ও পরিচালনা করতে পারেন। এতে অনেক ক্ষেত্রে ব্যয়বহুল স্বত্বাধিকারভিত্তিক মডেলের ওপর নির্ভরতা কমানো সম্ভব হয়। তবে সব ওপেন-ওয়েট মডেলকে সম্পূর্ণ ওপেন-সোর্স বলা যায় না; মডেলের লাইসেন্স ও ব্যবহারের শর্তের ওপর বিষয়টি নির্ভর করে।
প্রযুক্তি নির্মাতাদের জন্য ডিপসিকের মডেল ব্যবহারের খরচ গুগলের জেমিনি, অ্যানথ্রপিকের ক্লড কিংবা ওপেনএআইয়ের কোডেক্সের মতো বিভিন্ন বাণিজ্যিক এআই সেবার তুলনায় কম হতে পারে। এ কারণে কম খরচে এআইভিত্তিক অ্যাপ্লিকেশন, সফটওয়্যার ও অন্যান্য ডিজিটাল সেবা তৈরির ক্ষেত্রে ডিপসিক প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান তৈরি করেছে।
সব মিলিয়ে, যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি ব্যবস্থায় ডিপসিক নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত দেশটির এআই নিরাপত্তা নীতি এবং চীনের সঙ্গে প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরেছে। তবে নিষেধাজ্ঞার পেছনে নির্দিষ্ট নিরাপত্তাঝুঁকি সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ না করায় বিষয়টি নিয়ে আরও স্পষ্ট ব্যাখ্যার প্রয়োজন রয়েছে। একই সঙ্গে সরকারি খাতে এআই ব্যবহারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং উদ্ভাবনী প্রযুক্তির সুবিধা গ্রহণের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করাও সংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হয়ে থাকবে।









মন্তব্য
এখনো কেউ মন্তব্য করেননি। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।