মূল লেখায় যান
শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর ২০২৬ · ৭ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
শিরোনাম
সারাবিশ্ব

সুদানে ড্রোন হামলায় নিহত ১৫৩, ঘরছাড়া ৮ হাজার মানুষ

সুদানের সেনাবাহিনীর ড্রোন হামলায় বিতর্কিত আবিয়েই অঞ্চলের একটি বাজারে নিহতের সংখ্যা বেড়ে ১৫৩ জনে দাঁড়িয়েছে। দক্ষিণ সুদানের কর্মকর্তারা এ তথ্য জানিয়েছেন। সোমবারের ওই হামলার পর বাজারটিতে ভয়াবহ আগুন ছড়িয়ে পড়ে। এতে বহু মানুষের মরদেহ পুড়ে গেছে। এখনো উদ্ধারকাজ চলমান থাকায় নিহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা...

সুদানে ড্রোন হামলায় নিহত ১৫৩, ঘরছাড়া ৮ হাজার মানুষ

সুদানের সেনাবাহিনীর ড্রোন হামলায় বিতর্কিত আবিয়েই অঞ্চলের একটি বাজারে নিহতের সংখ্যা বেড়ে ১৫৩ জনে দাঁড়িয়েছে। দক্ষিণ সুদানের কর্মকর্তারা এ তথ্য জানিয়েছেন। সোমবারের ওই হামলার পর বাজারটিতে ভয়াবহ আগুন ছড়িয়ে পড়ে। এতে বহু মানুষের মরদেহ পুড়ে গেছে। এখনো উদ্ধারকাজ চলমান থাকায় নিহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এদিকে, হামলার পর নিরাপত্তাহীনতার কারণে প্রায় আট হাজার মানুষ নিজেদের ঘরবাড়ি ছেড়ে অন্যত্র আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছেন।

সাম্প্রতিক কয়েক দিনের ধারাবাহিক হামলায় সুদানে নিহতের সংখ্যা ২৫০ ছাড়িয়েছে। ২০২৩ সালের এপ্রিলে দেশটির সেনাবাহিনী ও আধাসামরিক বাহিনী র‍্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেসের (আরএসএফ) মধ্যে সংঘাত শুরু হয়। তিন বছরের বেশি সময় ধরে চলা এই যুদ্ধে দেশটিতে ভয়াবহ মানবিক সংকট তৈরি হয়েছে। সংঘাতের সঙ্গে বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠী ও বিদেশি শক্তির সংশ্লিষ্টতা নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে।

আবিয়েই অঞ্চলের ভারপ্রাপ্ত তথ্যমন্ত্রী ইয়োহানা আকোল এনগর মঙ্গলবার বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে জানান, সোমবারের হামলার পর প্রথমে ৭৩ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়। পরে উদ্ধারকাজ এগিয়ে নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নিহতের সংখ্যা বেড়ে ১৫৩ জনে পৌঁছায়। তিনি বলেন, বাজারে এখনো আগুন জ্বলছে এবং মরদেহ উদ্ধারের কাজ চলছে। আগুনে কয়েকজনের মরদেহ সম্পূর্ণ পুড়ে গেছে বলেও জানান তিনি।

মঙ্গলবার ঘটনাস্থলে ধারণ করা একটি ভিডিও যাচাই করেছে রয়টার্স। ভিডিওতে পুড়ে যাওয়া ও দুমড়েমুচড়ে যাওয়া যানবাহন এবং ভবনের ধ্বংসাবশেষ দেখা গেছে। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শনের সময়ও একটি ভবনে আগুন জ্বলতে দেখা যায়। হামলার পর বাজারটির ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি এবং উদ্ধারকাজের জটিল পরিস্থিতি ফুটে উঠেছে ভিডিওতে।

হামলার জন্য সুদানের সেনাবাহিনীকে দায়ী করেছেন ইয়োহানা আকোল এনগর। তবে এ অভিযোগের পক্ষে তিনি কোনো প্রমাণ উপস্থাপন করেননি। এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে রয়টার্স সুদানের সেনাবাহিনীর সঙ্গে যোগাযোগ করলেও তাৎক্ষণিকভাবে কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

তিনজন কূটনীতিক, একজন ত্রাণকর্মী ও সংঘাতবিষয়ক একজন বিশেষজ্ঞ রয়টার্সকে জানিয়েছেন, হামলায় বাজারের একটি জ্বালানি ডিপো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তাঁদের ভাষ্য অনুযায়ী, অতীতে ওই ডিপোটি আরএসএফের যোদ্ধাদের জ্বালানি সরবরাহের কাজে ব্যবহৃত হতো। তবে এ বিষয়ে আরএসএফের পক্ষ থেকেও তাৎক্ষণিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

আবিয়েই অঞ্চল নিয়ে সুদান ও দক্ষিণ সুদানের বিরোধ

২০১১ সালে সুদান থেকে স্বাধীনতা লাভ করে দক্ষিণ সুদান। স্বাধীনতার পর থেকে তেলসমৃদ্ধ আবিয়েই অঞ্চলের মালিকানা নিয়ে দুই দেশের মধ্যে বিরোধ চলছে। অঞ্চলটি যৌথ ব্যবস্থাপনার আওতায় পরিচালিত হলেও এর চূড়ান্ত রাজনৈতিক অবস্থান এখনো নির্ধারিত হয়নি। আবিয়েইয়ের সীমান্ত রয়েছে সুদানের কর্দোফান অঞ্চলের সঙ্গে, যা বর্তমানে দেশটির যুদ্ধের অন্যতম প্রধান সংঘাতপূর্ণ এলাকা।

সুদানের সেনাবাহিনী-সমর্থিত সরকারের কর্মকর্তারা রয়টার্সকে জানিয়েছেন, আবিয়েইয়ের কয়েকটি এলাকায় আরএসএফের উপস্থিতি রয়েছে। তবে অঞ্চলটিতে আরএসএফের সক্রিয় অবস্থানের কথা অস্বীকার করেছেন এনগর। দুই পক্ষের এসব দাবির সত্যতা তাৎক্ষণিকভাবে যাচাই করতে পারেনি রয়টার্স।

জাতিসংঘের অন্তর্বর্তী আবিয়েই নিরাপত্তা বাহিনী (ইউএনআইএসএফএ) গত মে মাসে সতর্ক করে বলেছিল, ওই অঞ্চলে আরএসএফের উপস্থিতির কারণে নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। অঞ্চলটির ভবিষ্যৎ অবস্থান নির্ধারণে দীর্ঘসূত্রতার কারণে স্থানীয় বাসিন্দাদের পাশাপাশি জাতিসংঘের কর্মীরাও ঝুঁকির মধ্যে রয়েছেন বলে জানিয়েছিল সংস্থাটি।

জাতিসংঘের মুখপাত্র স্তেফান দুজারিক আবিয়েইসহ বিভিন্ন এলাকায় ধারাবাহিক ড্রোন হামলার নিন্দা জানিয়েছেন। নিউইয়র্কে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, সুদানজুড়ে একের পর এক ড্রোন হামলা এবং গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর ক্ষয়ক্ষতি নিয়ে জাতিসংঘ গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। দীর্ঘদিন ধরে চলা সংঘাতের কারণে আগে থেকেই সংকটে থাকা সাধারণ মানুষের ওপর এসব হামলার প্রভাব অত্যন্ত গুরুতর বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

বিস্ফোরণের পর বাজারে আগুন, বাড়ছে হতাহতের সংখ্যা

ইয়োহানা আকোল এনগর জানান, হামলার পর বাজারে আগুন ছড়িয়ে পড়ায় উদ্ধারকর্মীদের মরদেহ উদ্ধারে বাধার মুখে পড়তে হচ্ছে। আগুনের তীব্রতা এবং ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির কারণে উদ্ধারকাজও জটিল হয়ে উঠেছে। সোমবারের হামলার পর প্রায় আট হাজার মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে অন্যত্র আশ্রয় নিয়েছেন বলে জানান তিনি।

দক্ষিণ সুদানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সোমবার গভীর রাতে এক বিবৃতিতে জানায়, আবিয়েই শহরের উত্তরে একটি বাজারে ড্রোন হামলা হয়েছে। তবে ওই বিবৃতিতে হতাহতের সংখ্যা উল্লেখ করা হয়নি। ঘটনার প্রতিবাদ জানাতে সুদানের রাষ্ট্রদূতকে তলব করা হয়েছে বলেও জানায় মন্ত্রণালয়।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক প্রত্যক্ষদর্শী রয়টার্সকে জানান, তিনি পরপর পাঁচটি শক্তিশালী বিস্ফোরণের শব্দ শুনেছিলেন। এর পরপরই জ্বালানির বাজারটিতে আগুন ধরে যায়। তিনি বলেন, বিস্ফোরণের পর লোকজন আহতদের সরিয়ে নিতে শুরু করেন। আহতদের পেট ও পায়ে বিস্ফোরণের টুকরার আঘাত লেগেছিল। ঘটনাস্থলের একটি জায়গায় আগুনে পুড়ে যাওয়া ২৮টি মরদেহও দেখেছেন বলে জানান তিনি।

ওই প্রত্যক্ষদর্শী আরও জানান, বাজারে তিনি আরএসএফ কিংবা অন্য কোনো বাহিনীর ইউনিফর্ম পরা যোদ্ধাদের দেখতে পাননি। বাজারটিতে চিনি, ময়দা ও বিস্কুটের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য বিক্রি হতো, যেগুলোর কিছু সুদানে পাঠানো হয়।

সুদানে বাড়ছে ড্রোন হামলা ও প্রাণহানি

সাম্প্রতিক সময়ে সুদানের সেনাবাহিনী ও আরএসএফের মধ্যে ড্রোন হামলার ঘটনা বেড়েছে। চলতি সপ্তাহে আরএসএফের নিয়ন্ত্রণে থাকা নিয়ালা শহর এবং সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণে থাকা খার্তুম বিমানবন্দরেও হামলার খবর পাওয়া গেছে। দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে এসব হামলায় বেসামরিক মানুষের প্রাণহানি এবং গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার ক্ষয়ক্ষতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।

স্থানীয় জরুরি সাড়া প্রদানকারী দলের তথ্য অনুযায়ী, রোববার সুদানের পশ্চিম কর্দোফান রাজ্যে ড্রোন হামলায় প্রায় ৮৪ জন নিহত ও ৬৫ জন আহত হন। রাজ্যটির বড় অংশ আরএসএফের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। পরদিন সোমবার সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণে থাকা খার্তুম বিমানবন্দরেও একাধিক ড্রোন হামলা হয়। ওই হামলায় চার শিশু নিহত হয়েছে বলে জানা গেছে।

স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবকদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, শুক্রবার আরএসএফের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত নিয়ালা শহরের একটি বাজারে হামলায় ২৩ জন নিহত এবং ৪৪ জন আহত হন। এসব হামলার ঘটনায় বেসামরিক মানুষের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

এদিকে, চাদের কর্মকর্তারা অভিযোগ করেছেন, সুদানের সেনাবাহিনী চাদের ভূখণ্ডেও ড্রোন হামলা চালিয়েছে। অন্যদিকে, জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞদের মতে, চাদের ভূখণ্ড নিয়মিতভাবে আরএসএফের রসদ সরবরাহের কাজে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বক্তব্য ও স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্যের প্রয়োজন রয়েছে।

সুদানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় গত আগস্টের শেষ দিকে জানিয়েছিল, দেশের নিরাপত্তা রক্ষায় সশস্ত্র বাহিনী কাজ করছে। এ ছাড়া গত ১০ অক্টোবর সুদান ও মিসরের সীমান্তের কাছে এক বিমান হামলায় ৭০ জনের বেশি খনিজ উত্তোলনকারী শ্রমিক নিহত হন বলে জানিয়েছে একটি স্থানীয় মানবাধিকার সংস্থা।

চিকিৎসাসেবার সংকটে আহতরা

আবিয়েই অঞ্চলে দীর্ঘদিন ধরেই সহিংসতা চলছে। বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠী ও সশস্ত্র গোষ্ঠীর মধ্যে সংঘর্ষের কারণে অঞ্চলটির নিরাপত্তা পরিস্থিতি বারবার অবনতি হয়েছে। সাম্প্রতিক বাজারে হামলাটিকে কয়েক বছরের মধ্যে অঞ্চলটির অন্যতম প্রাণঘাতী হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। সংঘাতের পাশাপাশি চিকিৎসাসামগ্রী ও স্বাস্থ্যসেবার ঘাটতি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।

দক্ষিণ সুদানের সরকার জানিয়েছে, প্রতিবেশী সুদানের চলমান যুদ্ধে তারা কোনো পক্ষ নেয়নি। তবে কূটনীতিক ও সংঘাতবিষয়ক বিশেষজ্ঞদের মতে, আরএসএফের রসদ সরবরাহের ক্ষেত্রে আবিয়েই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে জ্বালানি সরবরাহের কারণে অঞ্চলটির কৌশলগত গুরুত্ব রয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।

আন্তর্জাতিক চিকিৎসা সহায়তা সংস্থা মেদসাঁ সঁ ফ্রন্তিয়ের (এমএসএফ) জানিয়েছে, আবিয়েইয়ের কাছাকাছি আমেথ বেক হাসপাতালে তারা ২০ জনের বেশি আহত ব্যক্তির চিকিৎসা দিচ্ছে। আহতদের মধ্যে কয়েকজন আগুনে পুড়ে গুরুতর আহত হয়েছেন।

হাসপাতালটিতে এমএসএফের চিকিৎসা কার্যক্রমের ব্যবস্থাপক ক্রিশ্চিয়ান লিন্ডাউয়ার জানান, আহতদের অস্ত্রোপচার, ক্ষতস্থানে ব্যান্ডেজ করা এবং অন্যান্য জরুরি চিকিৎসাসেবা দেওয়া হচ্ছে। সংস্থাটির সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত ছবিতে দেখা গেছে, ব্যান্ডেজ বাঁধা কয়েকজন রোগী হাসপাতালের মেঝেতে শুয়ে রয়েছেন এবং তাঁদের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।

সুদানে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত, ধারাবাহিক ড্রোন হামলা এবং চিকিৎসাসেবার সীমাবদ্ধতার কারণে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ ক্রমেই বাড়ছে। আবিয়েইয়ের বাজারে হামলার পর বিপুল প্রাণহানি ও হাজারো মানুষের বাস্তুচ্যুত হওয়ার ঘটনা দেশটির চলমান মানবিক সংকটকে আরও গভীর করে তুলেছে। উদ্ধারকাজ অব্যাহত থাকায় হতাহতের সংখ্যা এবং ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণ চিত্র পেতে আরও সময় লাগতে পারে।

মন্তব্য

এখনো কেউ মন্তব্য করেননি। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।

আপনার মতামত লিখুন

০/২০০০