মূল লেখায় যান
শনিবার, ২৪ অক্টোবর ২০২৬ · ৮ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
শিরোনাম
সারাদেশ

১৫ বছর ধরে প্রতিদিন স্ত্রীর কবর পরিষ্কার করছেন ৮৫ বছরের আইনজীবী

দিনাজপুরের প্রবীণ আইনজীবী অ্যাডভোকেট মওলা বক্স। বয়স ৮৫ বছর। জীবনের এই পর্যায়েও প্রতিদিন সকালে তার দিন শুরু হয় এক বিশেষ দায়িত্ব দিয়ে। ফজরের নামাজ শেষে ঝাঁটা হাতে ছুটে যান কবরস্থানে। সেখানে প্রিয়তমা স্ত্রীর কবর পরিষ্কার করেন, পাশাপাশি পরিচ্ছন্ন রাখেন পুরো কবরস্থান। এভাবেই প্রায় ১৫ বছর ধরে স্ত্রীর প্রতি...

১৫ বছর ধরে প্রতিদিন স্ত্রীর কবর পরিষ্কার করছেন ৮৫ বছরের আইনজীবী

দিনাজপুরের প্রবীণ আইনজীবী অ্যাডভোকেট মওলা বক্স। বয়স ৮৫ বছর। জীবনের এই পর্যায়েও প্রতিদিন সকালে তার দিন শুরু হয় এক বিশেষ দায়িত্ব দিয়ে। ফজরের নামাজ শেষে ঝাঁটা হাতে ছুটে যান কবরস্থানে। সেখানে প্রিয়তমা স্ত্রীর কবর পরিষ্কার করেন, পাশাপাশি পরিচ্ছন্ন রাখেন পুরো কবরস্থান। এভাবেই প্রায় ১৫ বছর ধরে স্ত্রীর প্রতি ভালোবাসার স্মৃতি আগলে রেখেছেন তিনি।

দিনাজপুরের বিরামপুরের এই প্রবীণ আইনজীবীর জীবনের গল্পে রয়েছে ভালোবাসা, ত্যাগ আর বিচ্ছেদের বেদনা। ১৯৭০ সালে সব সামাজিক বাধা পেরিয়ে সনাতন ধর্মাবলম্বী তরুণী জাহানারা বেগম ঝর্ণাকে বিয়ে করেন তিনি। পারস্পরিক বিশ্বাস, শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় গড়ে ওঠে তাদের সংসার। দুই ছেলে ও এক মেয়েকে নিয়ে কাটছিল তাদের জীবন। সন্তানরাও উচ্চশিক্ষা অর্জন করেছেন এবং আইন বিষয়ে পড়াশোনা করেছেন।

কিন্তু ২০১১ সালে সেই সংসারে নেমে আসে শোকের ছায়া। দীর্ঘ চার দশকের জীবনসঙ্গী জাহানারা বেগম ঝর্ণা মারা যান। স্ত্রীর মৃত্যুতে নিঃসঙ্গ হয়ে পড়েন মওলা বক্স। প্রিয় মানুষটির স্মৃতি ধরে রাখতে এরপর থেকেই প্রতিদিন কবরস্থানে যাওয়া শুরু করেন তিনি।

প্রতিদিন ফজরের নামাজ শেষে স্ত্রীর কবরের পাশে দাঁড়িয়ে তার আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন। এরপর নিজের হাতে পরিষ্কার করেন কবরটি। কবরের আশপাশে পড়ে থাকা শুকনো পাতা, ডালপালা ও আগাছা সরিয়ে রাখেন। একসময় শুধু স্ত্রীর কবর পরিষ্কারের কাজটি ছড়িয়ে পড়ে পুরো কবরস্থানে। এখন নিয়মিত সেখানকার চলাচলের পথ ও আশপাশও পরিষ্কার করেন তিনি।

ঝড়-বৃষ্টি কিংবা শীত, কোনো কিছুই তার এই অভ্যাসে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি। বছরের পর বছর ধরে নীরবে কাজটি করে যাচ্ছেন এই প্রবীণ আইনজীবী। তার কাছে এটি শুধু পরিচ্ছন্নতার কাজ নয়, বরং প্রিয় মানুষটির প্রতি ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশের একটি উপায়।

ব্যক্তিগত জীবনের বাইরেও এলাকায় নানা সামাজিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত ছিলেন মওলা বক্স। বিরামপুর জেলা বাস্তবায়ন আন্দোলনের স্বপ্নদ্রষ্টা ও সভাপতি হিসেবে তিনি দীর্ঘদিন এলাকার উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে ভূমিকা রেখেছেন। তবে কবরস্থানে গেলে সামাজিক পরিচয় কিংবা পেশাগত অবস্থানের চেয়ে বড় হয়ে ওঠে স্ত্রীর প্রতি তার ভালোবাসা।

স্ত্রীর স্মৃতিচারণা করতে গিয়ে আবেগাপ্লুত মওলা বক্স বলেন, ‘আমার প্রয়াত স্ত্রী সেদিন নিজের পরিবার, ধর্ম ও চেনা পরিবেশ ছেড়ে কেবল আমার ওপর বিশ্বাস রেখে ঘর বেঁধেছিল। তার সেই নিঃস্বার্থ ভালোবাসার ঋণ শোধ করার সাধ্য আমার নেই। তার সেই আত্মত্যাগকে স্মরণ করেই প্রতিদিন কবরস্থানে আসি এবং নিজ হাতে পরিচ্ছন্নতার কাজ করি।’

ভালোবাসার গভীরতা বোঝাতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘ভালোবাসা যত বড় হয়, জীবনটা তত নয়।’

সময়ের সঙ্গে বয়স বেড়েছে, বদলেছে জীবনের অনেক কিছু। কিন্তু স্ত্রীর প্রতি মওলা বক্সের ভালোবাসায় যেন ভাটা পড়েনি। প্রতিদিন কবরস্থানে গিয়ে পরিচ্ছন্নতার কাজ করার মধ্য দিয়েই তিনি আগলে রেখেছেন প্রিয় মানুষটির স্মৃতি। তার এই নীরব ভালোবাসার গল্প মনে করিয়ে দেয়, মানুষের জীবনে কিছু সম্পর্ক সময়ের সীমা পেরিয়েও বেঁচে থাকে।

মন্তব্য

এখনো কেউ মন্তব্য করেননি। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।

আপনার মতামত লিখুন

০/২০০০