পোশাকশ্রমিকদের ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৩০ হাজার টাকা করার দাবিতে রাজধানীর মিরপুরে টানা দুই দিনের বিক্ষোভ, সংঘর্ষ ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় চারটি মামলা হয়েছে। এসব মামলায় অজ্ঞাতপরিচয় প্রায় সাড়ে ১০ হাজার ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে। এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত ২২ জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
সোমবার (২ নভেম্বর) দুপুরে মিরপুর মডেল ও পল্লবী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা (ওসি) এসব তথ্য জানিয়েছেন।
মিরপুর মডেল থানার ওসি মো. হাফিজুর রহমান জানান, ট্রাফিক বক্স ভাঙচুর ও পুলিশের ওপর হামলার অভিযোগে মিরপুর মডেল থানায় একটি মামলা হয়েছে। এতে অজ্ঞাতপরিচয় তিন হাজার ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে। এ মামলায় এখন পর্যন্ত ছয়জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। সোমবারও কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের পরিচয় ও সংশ্লিষ্টতা যাচাই করা হচ্ছে। সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করে গ্রেপ্তার অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
অন্যদিকে পল্লবী থানার ওসি জালাল উদ্দিন জানান, পুলিশের গাড়িতে আগুন দেওয়া, পুলিশের ওপর হামলা, সরকারি কাজে বাধা এবং ট্রাফিক বক্স ভাঙচুরের অভিযোগে তাঁর থানায় তিনটি মামলা হয়েছে। সব কটি মামলার বাদী পুলিশ। প্রতিটি মামলায় অজ্ঞাতপরিচয় দুই হাজার থেকে আড়াই হাজার ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে। এসব মামলায় এখন পর্যন্ত ১৬ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
এদিকে গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) দাবি, শ্রমিকদের ন্যায্য দাবিতে চলা আন্দোলনকে ব্যবহার করে মিরপুরে সহিংসতা সৃষ্টির পরিকল্পনা করেছিলেন কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতা-কর্মীদের একটি অংশ। তাঁরা অনলাইন গ্রুপের মাধ্যমে সংগঠিত হয়েছিলেন। আন্দোলনের আড়ালে বড় ধরনের নাশকতার পরিকল্পনাও ছিল তাঁদের।
ডিবির দাবি, মিরপুরে আটক ব্যক্তিদের মধ্যে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের ১১ জন নেতা-কর্মী রয়েছেন। তাঁরা স্থানীয় কোনো পোশাক কারখানার শ্রমিক নন। বিভিন্ন জেলা থেকে এসে শ্রমিক আন্দোলনের আড়ালে নাশকতার উদ্দেশ্যে মিরপুরে জড়ো হয়েছিলেন। সাধারণ শ্রমিকদের আন্দোলনকে ভিন্ন খাতে পরিচালিত করে জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি এবং দেশের পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করা হচ্ছিল বলে দাবি গোয়েন্দা পুলিশের।
এদিকে সোমবার সকাল থেকেই মিরপুরে সতর্ক অবস্থানে ছিলেন পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা। সকাল থেকে মিরপুর-১০ নম্বর গোলচত্বর ও আশপাশের এলাকায় পুলিশ মোতায়েন থাকতে দেখা যায়। সেখানে দাঙ্গা নিয়ন্ত্রণে ব্যবহৃত যানবাহন ও জলকামানও প্রস্তুত রাখা হয়।
সকাল পৌনে ১১টার দিকে মিরপুর-১০ নম্বরের সেনপাড়া পর্বতা এলাকার একটি গলি দিয়ে শ্রমিকেরা সড়কে নামার চেষ্টা করেন। এ সময় তাঁদের ছত্রভঙ্গ করতে ধাওয়া দেয় পুলিশ। কয়েকটি কাঁদানে গ্যাসের শেলও ছোড়া হয়। পরে মিরপুর-২ নম্বর স্টেডিয়ামের পাশের প্রশিকা মোড় এলাকায় শ্রমিকেরা সড়কে নামার চেষ্টা করলে পুলিশ তাঁদের সরিয়ে দেয়।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, রূপনগর এলাকা থেকে শ্রমিকেরা বিচ্ছিন্নভাবে মিরপুর-২ নম্বর স্টেডিয়ামের পাশ দিয়ে প্রশিকা মোড়ের দিকে আসছিলেন। তাঁরা সড়কে নামার চেষ্টা করলে বেলা ১১টার দিকে পুলিশ বাধা দেয়। এ সময় পুলিশ ও শ্রমিকদের মধ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।
তবে সকাল সাড়ে ১০টা পর্যন্ত মিরপুর-১০ নম্বর গোলচত্বর ও আশপাশের সড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক ছিল। সাধারণ মানুষের চলাচলেও কোনো বিঘ্ন দেখা যায়নি।
‘সীমান্তের ওপারের ইশারায় অস্থিতিশীল করার চেষ্টা’
সোমবার সকালে সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে পোশাক কারখানার মালিকদের সাথে বৈঠক করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। বৈঠকে তিনি দাবি করেন, শ্রমিক আন্দোলনের নামে সীমান্তের ওপারের ইশারায় দেশকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা চলছে।
এ ধরনের কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে দেশে অস্থিরতা সৃষ্টির চেষ্টা করা হলে কঠোর হাতে দমন করা হবে বলেও হুঁশিয়ারি দেন তিনি।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, প্রধানমন্ত্রী শ্রমিকদের স্বার্থ রক্ষা ও জীবনমান উন্নয়নের নির্দেশনা দিয়েছেন। তাঁদের সার্বিক বিষয় বিবেচনায় নিয়ে অত্যন্ত সহানুভূতির সাথে ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ করতে বলেছেন। মালিক ও শ্রমিক উভয় পক্ষের আলোচনার মাধ্যমে বাস্তবতা বিবেচনা করে মজুরি নির্ধারণ করা হবে।
তিনি আরও বলেন, পতিত স্বৈরাচার ও ফ্যাসিবাদের কিছু পক্ষ নিরীহ শ্রমিকদের ব্যবহার করে দেশে অস্থিরতা সৃষ্টির চেষ্টা করছে।
সোমবার বিকেলে শ্রমিক সংগঠনগুলোর নেতাদের সঙ্গে বৈঠকে বসার কথা রয়েছে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর। সেখানে চলমান আন্দোলন ও শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণের বিষয়ে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে।
পরিস্থিতির উন্নতি না হলে কারখানা বন্ধের সিদ্ধান্ত মালিকদের
পোশাকশিল্প এলাকায় শ্রমিক অসন্তোষ ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি না হলে কারখানা বন্ধ রাখতে বাধ্য হবেন বলে জানিয়েছেন মালিকরা। এ বিষয়ে গত রোববার বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বাবু সতর্ক করেন।
শিল্পাঞ্চলে শ্রমিক অসন্তোষের কারণে সৃষ্ট পরিস্থিতি নিয়ে রোববার বিজিএমইএর উত্তরা কার্যালয়ে পোশাকশিল্প মালিকদের একটি সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় সিদ্ধান্ত হয়, নতুন করে মজুরি বোর্ড গঠনের পরও শ্রমিকেরা কাজে যোগ না দিলে শ্রম আইন ২০০৬-এর ১৩(১) ধারা অনুযায়ী কারখানা বন্ধ রাখা হবে।
বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বাবু বলেন, মজুরি বোর্ড গঠনের পরও শ্রমিকেরা কাজে না ফিরলে প্রতিদিন কারখানা চালু রাখা কঠিন হয়ে পড়বে। সে ক্ষেত্রে শ্রম আইনের ১৩(১) ধারা অনুযায়ী কারখানা বন্ধ রাখতে পারবেন মালিকরা।
তিনি আরও জানান, শ্রমিকেরা কাজে যোগ না দেওয়ায় গত রোববার ৫২৯টি কারখানায় উৎপাদন কার্যক্রম চালানো সম্ভব হয়নি।









মন্তব্য
এখনো কেউ মন্তব্য করেননি। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।