মূল লেখায় যান
শনিবার, ২৪ অক্টোবর ২০২৬ · ৮ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
শিরোনাম
জাতীয়

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রত্যাশা মাথায় রেখে সংবিধান সংশোধনের আহ্বান আসিফ নজরুলের

সংবিধান সংশোধন নিয়ে চলমান আলোচনায় প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা, সংসদের স্থায়ী কমিটিগুলোকে কার্যকর করা এবং সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর নিয়োগপ্রক্রিয়া সংস্কারের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন ঢাকা বিশ

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রত্যাশা মাথায় রেখে সংবিধান সংশোধনের আহ্বান আসিফ নজরুলের
ছবি: সংগৃহীত

সংবিধান সংশোধন নিয়ে চলমান আলোচনায় প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা, সংসদের স্থায়ী কমিটিগুলোকে কার্যকর করা এবং সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর নিয়োগপ্রক্রিয়া সংস্কারের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক ও সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল।

শনিবার (২৪ অক্টোবর) সকাল ১১টায় জাতীয় সংসদ ভবনে সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত বিশেষ কমিটির বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে তিনি এসব কথা বলেন।

তিনি বলেন, সংবিধানে যেকোনো ইতিবাচক পরিবর্তনই সংস্কার হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। তবে পরিবর্তনের ক্ষেত্রে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা ও জনগণের প্রত্যাশাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।

আসিফ নজরুল আরও বলেন, বিশেষ কমিটির বৈঠকে অত্যন্ত সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে আলোচনা হয়েছে। কমিটির নেতৃত্বে থাকা সালাহউদ্দিন আহমেদ সবাইকে নিজেদের মতামত প্রকাশের সুযোগ দিচ্ছেন এবং অংশগ্রহণকারীরা স্বাধীনভাবে বিভিন্ন বিষয়ে বক্তব্য রাখছেন। সংবিধানের গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন বিধান, রাষ্ট্রের সাংবিধানিক কাঠামো এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও কার্যকর করার বিষয়গুলো আলোচনায় স্থান পেয়েছে।

তিনি আরও বলেন, বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। রাষ্ট্রের নির্বাহী কাঠামোয় ক্ষমতার ভারসাম্য নিশ্চিত করা এবং সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকারিতা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। পাশাপাশি বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা, সংসদের স্থায়ী কমিটিগুলোকে আরও ক্ষমতাবান করা এবং বিভিন্ন সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে নিয়োগের পদ্ধতি নিয়ে মতবিনিময় হয়েছে।

সংসদের স্থায়ী কমিটিগুলোর কার্যকারিতা বাড়ানোর বিষয়ে নিজের অবস্থান তুলে ধরে আসিফ নজরুল বলেন, গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি স্থায়ী কমিটির প্রধান হিসেবে বিরোধী দলের সদস্যদের রাখার অনুরোধ জানানো হয়েছে। সংসদীয় কার্যক্রমে জবাবদিহি ও ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে স্থায়ী কমিটিগুলোর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। এ কমিটিগুলো যেন স্বাধীনভাবে ও কার্যকরভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারে, সে জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া জরুরি।

সংবিধানের ৭৬ অনুচ্ছেদের বিষয়টি উল্লেখ করে তিনি বলেন, সংসদের স্থায়ী কমিটিগুলো যাতে যথাযথভাবে কাজ করতে পারে, সে জন্য ওই অনুচ্ছেদে আইন প্রণয়নের যে সুযোগ রয়েছে, তা কাজে লাগানোর অনুরোধ জানানো হয়েছে। এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নেয়ার কথা জানিয়েছেন। তবে স্থায়ী কমিটির প্রধান পদে বিরোধী দলের সদস্যদের রাখার প্রস্তাবের বিষয়ে বৈঠকে কোনো উত্তর দেননি।

বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার প্রশ্নে নিজের হতাশার কথা তুলে ধরে আসিফ নজরুল বলেন, সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ আইন এবং সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় আইন বাদ দেয়ার বিষয়টি নিয়ে আমি ব্যক্তিগতভাবে হতাশা প্রকাশ করেছি। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা সুদৃঢ় করতে বিচারক নিয়োগের স্বচ্ছ ও কার্যকর ব্যবস্থা এবং বিচার বিভাগের নিজস্ব প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা গুরুত্বপূর্ণ।

আসিফ নজরুল বলেন, বিএনপির নিজস্ব অঙ্গীকারের মধ্যেও এসব উদ্যোগের পক্ষে অবস্থান ছিল বলে আমি বৈঠকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছি। এ সময় আইনমন্ত্রী আমাকে জানিয়েছেন, বিষয়গুলো পুরোপুরি বাদ দেয়া হয়নি; পরবর্তী সময়ে এগুলো নিয়ে আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নেয়া হবে। ফলে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে এসব আইন প্রণয়নের বিষয়টি ভবিষ্যতে কীভাবে এগোয়, তা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা নিয়েও বৈঠকে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে বলে জানান আসিফ নজরুল। তিনি বলেন, বিষয়টি অত্যন্ত বিতর্কিত ও সংবেদনশীল হওয়ায় এ ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মতৈক্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেয়া প্রয়োজন। জুলাই সনদে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের বিষয়ে একাধিক পদ্ধতির উল্লেখ রয়েছে। তার পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, প্রস্তাবিত নয়টি পদ্ধতির মধ্যে আটটি বিষয়ে দলগুলোর মধ্যে ঐকমত্য রয়েছে, আর একটি বিষয়ে মতপার্থক্য রয়ে গেছে।

আসিফ নজরুলের বলেন, একটি বিষয়ে মতভেদ থাকার কারণে পুরো প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত না করে সংশ্লিষ্ট বিরোধী দলগুলোর সাথে আলোচনা করে গ্রহণযোগ্য সমাধানে পৌঁছানো উচিত। এ বিষয়ে বিরোধী দলের সদস্যদেরও আলোচনার প্রক্রিয়ায় যুক্ত করার অনুরোধ জানানো হয়েছে। কমিটির পক্ষ থেকে আমাকে জানানো হয়েছে, এ বিষয়ে বিভিন্নভাবে চেষ্টা করা হয়েছে এবং উদ্যোগের বিস্তারিত ব্যাখ্যাও দেয়া হয়েছে।

সংবিধান সংশোধনের পুরো প্রক্রিয়ায় জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা যেন উপেক্ষিত না হয়, সে বিষয়েও সতর্ক করা হয়েছে উল্লেখ করে আসিফ নজরুল বলেন, বর্তমান কমিটির আলোচনা জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে হচ্ছে। তাই অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে এবার আরও কার্যকর ও ইতিবাচক পরিবর্তনের দিকে এগিয়ে যেতে হবে।

নিজের অতীত অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ২০১১ সালে সংসদীয় সংবিধান সংশোধন কমিটির বৈঠকে আমন্ত্রণ পেয়ে আমি মতামত দিয়েছিলাম। তখন অনেক প্রত্যাশা নিয়ে অংশ নিলেও পরবর্তী সময়ে সেই প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। ওই অভিজ্ঞতার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি বলেন, এবারও যেন একই ধরনের হতাশার পুনরাবৃত্তি না ঘটে। বরং জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে মানুষের যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে, তা যেন সংবিধান সংশোধনের উদ্যোগে প্রতিফলিত হয়।

নির্বাচনব্যবস্থা এবং সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ নিয়েও বৈঠকে আলোচনা হয়েছে বলে জানান তিনি। এসব বিষয়ের পাশাপাশি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর নিয়োগপদ্ধতি পর্যালোচনা এবং রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কার্যকারিতা বাড়ানোর প্রশ্নও আলোচনায় এসেছে। তবে এসব বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের পরিবর্তে এখনো আলোচনা ও মতবিনিময়ের পর্যায়েই রয়েছে কমিটির কার্যক্রম।

গণভোট আয়োজন এবং সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন করা হবে, নাকি সংবিধান সংশোধন কমিটির মাধ্যমেই পরিবর্তন আনা হবে, সে প্রসঙ্গে আসিফ নজরুল বলেন, বিষয়টি বর্তমানে রাজনৈতিক বিতর্ক ও মতপার্থক্যের অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ বিতর্কে জড়াতে চান না বলে জানান তিনি। তবে তিনি বলেন, সংবিধানে কোনো পরিবর্তন ইতিবাচক হলে সেটিকে সংস্কার হিসেবে বিবেচনা করা যায়।

তিনি বলেন, সংবিধান পরিবর্তনের ক্ষেত্রে কোন প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হচ্ছে, তার চেয়ে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জন করা যাচ্ছে কি না, সেটি বেশি গুরুত্বপূর্ণ। পরিবর্তনের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো আরও কার্যকর হচ্ছে কি না, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় ভারসাম্য প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে কি না এবং মানুষের প্রত্যাশা পূরণ হচ্ছে কি না, সেদিকেই বেশি মনোযোগ দেয়া প্রয়োজন।

মন্তব্য

এখনো কেউ মন্তব্য করেননি। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।

আপনার মতামত লিখুন

০/২০০০