মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের বিস্তার রোধ, গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথে অবাধ নৌ চলাচল নিশ্চিত করা এবং সৌদি আরবের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনায় বসেছেন ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের আট দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা। শুক্রবার তুরস্কের ইস্তাম্বুলে অনুষ্ঠিত এ বৈঠকে ইরান-সংকটের পাশাপাশি ফিলিস্তিন পরিস্থিতি, ইয়েমেনের হুথি গোষ্ঠীর হামলা এবং রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাব নিয়েও আলোচনা হয়েছে। আঞ্চলিক উত্তেজনা আরও বিস্তৃত হয়ে বৈশ্বিক নিরাপত্তা ও বাণিজ্যিক নৌ চলাচলে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে-এমন উদ্বেগের মধ্যে বৈঠকটিকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
তুরস্কের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্রের বরাত দিয়ে জানা গেছে, বৈঠকে যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, জার্মানি ও ইতালির পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা অংশ নিয়েছেন। তাঁদের সঙ্গে আলোচনায় যুক্ত হয়েছেন তুরস্ক, সৌদি আরব, পাকিস্তান ও মিসরের প্রতিনিধিরা। এসব দেশকে নিয়ে গঠিত ‘আর৪’ গোষ্ঠীর প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণে ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর মধ্যে নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক সমন্বয় জোরদারের বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।
বসফরাস প্রণালির তীরবর্তী একটি হোটেলে বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়। মূল আলোচনা শুরুর আগে ইউরোপীয় দেশগুলোর পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা এবং মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর প্রতিনিধিরা পৃথক বৈঠক করেন। পরবর্তী আলোচনায় আঞ্চলিক সংঘাতের বিস্তার ঠেকানো, গুরুত্বপূর্ণ নৌপথের নিরাপত্তা রক্ষা এবং বিভিন্ন সংকট মোকাবিলায় সমন্বিত কূটনৈতিক উদ্যোগ গ্রহণের বিষয়গুলো প্রাধান্য পায়।
হরমুজ প্রণালি ও সৌদি আরবের নিরাপত্তা আলোচনার কেন্দ্রে
বৈঠকের অন্যতম প্রধান আলোচ্য বিষয় হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা। বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথগুলোর একটি এই প্রণালি দিয়ে বিপুল পরিমাণ তেল ও গ্যাস আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ করা হয়। ফলে এখানে নৌ চলাচল ব্যাহত হলে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ, পরিবহন ব্যয় এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে।
যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এড মিলিব্যান্ডের দপ্তর জানিয়েছে, ইস্তাম্বুলের বৈঠকে হরমুজ প্রণালি এবং সৌদি আরবের নিরাপত্তা পরিস্থিতি বিশেষ গুরুত্ব পাবে। হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের অধিকার ও স্বাধীনতা পুনঃপ্রতিষ্ঠায় কূটনৈতিক সমাধানের পক্ষে যুক্তরাজ্যের অবস্থান তুলে ধরার কথা রয়েছে।
ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দপ্তরের ভাষ্য অনুযায়ী, ইরানের কৌশল ও কর্মকাণ্ড কীভাবে মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য অঞ্চলেও প্রভাব ফেলছে, তা আলোচনায় তুলে ধরা হবে। সৌদি আরবে হামলা আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতা বাড়ানোর পাশাপাশি বাব আল-মান্দেব প্রণালি ও সুয়েজ খালের মতো গুরুত্বপূর্ণ নৌপথের নিরাপত্তার ওপরও চাপ সৃষ্টি করতে পারে বলে সতর্ক করা হয়েছে।
অন্যদিকে, ফ্রান্সের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বৈঠকে ইরান-সংকটের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা হবে। অঞ্চলজুড়ে অস্থিতিশীলতা ও অনিশ্চয়তা বেড়ে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে এ ধরনের সমন্বিত বৈঠককে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করছে প্যারিস। ফরাসি কর্তৃপক্ষের মতে, সংশ্লিষ্ট দেশগুলো নিজেরা যেসব সংকট সৃষ্টি করেনি, অথচ যেগুলোর প্রভাব তাদের অর্থনীতি ও নিরাপত্তার ওপর পড়ছে, সেগুলো মোকাবিলায় ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর মধ্যে সহযোগিতা বাড়ানো প্রয়োজন।
হুথিদের হামলায় সৌদি আরবের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ
ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুথি গোষ্ঠীর হামলা এবং সামুদ্রিক নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ সৌদি আরবের পরিস্থিতিকে আলোচনার অন্যতম কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, হামলার কারণে দেশটির প্রধান বিমানবন্দর বন্ধ রাখতে হয়েছে এবং একটি বড় বিনিয়োগ সম্মেলন স্থগিত করা হয়েছে। একই সঙ্গে সমুদ্রপথে অবরোধ ও নিরাপত্তাঝুঁকির কারণে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ অপরিশোধিত তেল রপ্তানিকারক দেশটির জ্বালানি রপ্তানি নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
এ পরিস্থিতিতে সৌদি আরবের পাশে দাঁড়ানোর বার্তা দিয়েছে কয়েকটি মিত্রদেশ। বুধবার সৌদি আরব সফরে গিয়ে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ জানিয়েছেন, লোহিত সাগরের তীরবর্তী ইয়ানবু তেল টার্মিনালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ফরাসি বাহিনী সহায়তা করবে। জ্বালানি অবকাঠামোর নিরাপত্তা রক্ষা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে তেল সরবরাহ অব্যাহত রাখার ক্ষেত্রে এই উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হচ্ছে।
এর আগের দিন যুক্তরাজ্যও জানিয়েছিল, হুথি গোষ্ঠীর হামলার ক্রমবর্ধমান হুমকি মোকাবিলায় সৌদি আরবকে সহায়তা করতে দেশটি যুদ্ধবিমান মোতায়েন করবে। এসব উদ্যোগের মধ্য দিয়ে সৌদি আরবের নিরাপত্তা এবং লোহিত সাগরকেন্দ্রিক সামুদ্রিক বাণিজ্যপথ সুরক্ষার বিষয়টি আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে আরও গুরুত্ব পাচ্ছে।
আঞ্চলিক নিরাপত্তায় নিজেদের দায়িত্ব নেওয়ার আহ্বান তুরস্কের
বৈঠকের আগে একটি মধ্যস্থতাবিষয়ক সম্মেলনে বক্তব্য দেন তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান। এ সময় তিনি আঞ্চলিক সহযোগিতার ওপর গুরুত্বারোপ করে বলেন, ‘স্থায়ী সমাধান বাইরে থেকে চাপিয়ে দেওয়া যায় না।’
তুরস্কের কর্মকর্তাদের মতে, ইস্তাম্বুলের বৈঠকে ফিদান তুলে ধরবেন যে আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর নিজেদের দায়িত্ব নিতে হবে। তাঁর বক্তব্যে আঞ্চলিক দেশগুলোর নিজস্ব উদ্যোগ, পারস্পরিক আস্থা এবং নেতৃত্বে গড়ে ওঠা সহযোগিতা কাঠামোকে অগ্রাধিকার দেওয়ার বিষয়টি গুরুত্ব পাবে।
ফিদানের মতে, একটি অঞ্চলের বিরোধ যেন অন্য অঞ্চলের সংকটকে আরও জটিল করে না তোলে, সে বিষয়ে সতর্ক থাকা প্রয়োজন। কোনো সংঘাতকে নতুন এলাকায় ছড়িয়ে পড়তে দেওয়া উচিত নয়। একইভাবে, স্থানীয় পর্যায়ের উত্তেজনা যেন বৃহত্তর আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতা কিংবা আন্তর্জাতিক নিরাপত্তাসংকটে রূপ না নেয়, সে জন্য সমন্বিত কূটনৈতিক উদ্যোগ জোরদার করা জরুরি।
ফিলিস্তিনে ইসরায়েলি বসতি সম্প্রসারণ নিয়েও আলোচনা
ইস্তাম্বুলের বৈঠকে ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইসরায়েলের বসতি সম্প্রসারণ এবং বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতার বিষয়টিও আলোচনায় আসার কথা রয়েছে। এসব কর্মকাণ্ড বন্ধে ইসরায়েলের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ বাড়ানোর আহ্বান জানাবেন তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান। তুরস্ক বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতাকে ‘বসতি স্থাপনকারীদের সন্ত্রাসবাদ’ হিসেবে অভিহিত করে থাকে।
ফিলিস্তিন পরিস্থিতি দীর্ঘদিন ধরে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাগত উত্তেজনার অন্যতম প্রধান কারণ। বসতি সম্প্রসারণ, সহিংসতা এবং সংশ্লিষ্ট বিরোধগুলোর কারণে শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ প্রেক্ষাপটে আন্তর্জাতিক চাপ বৃদ্ধি, কূটনৈতিক যোগাযোগ জোরদার এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে সমাধানের পথ খুঁজে বের করার বিষয়টি আলোচনায় গুরুত্ব পেতে পারে।
একই সঙ্গে হুথি গোষ্ঠীর হামলার মুখে সৌদি আরবের নিরাপত্তার প্রতি তুরস্কের সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করবেন ফিদান। হরমুজ ও বাব আল-মান্দেব প্রণালিতে অবাধ এবং নিরাপদ নৌ চলাচল নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তার ওপরও তিনি জোর দেবেন বলে তুরস্কের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবও আলোচনায়
মধ্যপ্রাচ্যের সংকটের পাশাপাশি কৃষ্ণসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা পরিস্থিতিও ইস্তাম্বুলের বৈঠকে গুরুত্ব পাবে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাব যাতে ওই অঞ্চলে আরও বিস্তৃত না হয়, সে লক্ষ্যে তুরস্কের নেওয়া উদ্যোগগুলো তুলে ধরবেন হাকান ফিদান।
কৃষ্ণসাগর ইউরোপ ও আশপাশের অঞ্চলের বাণিজ্য, জ্বালানি পরিবহন এবং সামুদ্রিক নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে এ অঞ্চলে নিরাপত্তাঝুঁকি বৃদ্ধি পাওয়ায় সংঘাতের বিস্তার রোধ এবং নৌ চলাচল স্বাভাবিক রাখার বিষয়টি আন্তর্জাতিক আলোচনায় রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের সঙ্গে ইউরোপের নিরাপত্তা পরিস্থিতির সম্ভাব্য যোগসূত্রও বৈঠকটিকে বাড়তি গুরুত্ব দিয়েছে।
সমন্বিত কূটনৈতিক উদ্যোগের ওপর গুরুত্ব
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাত, সৌদি আরবের নিরাপত্তা, হরমুজ ও বাব আল-মান্দেব প্রণালিতে নৌ চলাচল, ফিলিস্তিন পরিস্থিতি এবং কৃষ্ণসাগরীয় অঞ্চলের স্থিতিশীলতা-সব মিলিয়ে আট দেশের এই বৈঠকের আলোচ্য বিষয়গুলো পরস্পরের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। বিশেষ করে গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথে নিরাপত্তাঝুঁকি বাড়লে জ্বালানি সরবরাহ, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং বিভিন্ন দেশের অর্থনীতিতে এর প্রভাব পড়তে পারে।
এ কারণে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক অংশীদারদের মধ্যে নিয়মিত যোগাযোগ, কূটনৈতিক সমন্বয় এবং সংঘাতের বিস্তার ঠেকানোর উদ্যোগকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। তবে বৈঠক শেষে কোনো নির্দিষ্ট চুক্তি, যৌথ সিদ্ধান্ত কিংবা সংঘাত বন্ধের বিষয়ে সমঝোতা হয়েছে কি না, সে সম্পর্কে প্রতিবেদনে নিশ্চিত কোনো তথ্য উল্লেখ করা হয়নি।









মন্তব্য
এখনো কেউ মন্তব্য করেননি। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।