মূল লেখায় যান
বুধবার, ৪ নভেম্বর ২০২৬ · ১৯ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
শিরোনাম
প্রিয় চট্টগ্রাম

পাহাড়তলী কলেজে আর্থিক অনিয়ম, অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থার সুপারিশ

কলেজের শ্রেণিকক্ষ ও অডিটোরিয়াম ভাড়া দেওয়া হয়েছে। কলেজ প্রাঙ্গণে বসবাসের সুযোগ পেয়েছে বহিরাগত একটি পরিবারও। এসব ব্যবহারের বিনিময়ে অর্থ নেওয়া হলেও তা কলেজের তহবিলে জমা পড়ার কোনো রসিদ বা ভাউচার দেখাতে পারেনি কর্তৃপক্ষ। অন্যদিকে, কলেজের আবাসিক সুবিধা ভোগ করেও

পাহাড়তলী কলেজে আর্থিক অনিয়ম, অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থার সুপারিশ

কলেজের শ্রেণিকক্ষ ও অডিটোরিয়াম ভাড়া দেওয়া হয়েছে। কলেজ প্রাঙ্গণে বসবাসের সুযোগ পেয়েছে বহিরাগত একটি পরিবারও। এসব ব্যবহারের বিনিময়ে অর্থ নেওয়া হলেও তা কলেজের তহবিলে জমা পড়ার কোনো রসিদ বা ভাউচার দেখাতে পারেনি কর্তৃপক্ষ। অন্যদিকে, কলেজের আবাসিক সুবিধা ভোগ করেও দায়িত্ব ভাতা নিয়েছেন অধ্যক্ষ। সরকারি ইনক্রিমেন্টের পাশাপাশি কলেজের তহবিল থেকেও নিয়েছেন অতিরিক্ত অর্থ। চট্টগ্রামের পাহাড়তলী কলেজে আর্থিক ও প্রশাসনিক অনিয়মের এমন চিত্র উঠে এসেছে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) তদন্তে।

কলেজটির অধ্যক্ষ শ্যামল কান্তি মজুমদারের বিরুদ্ধে এসব অনিয়মের প্রমাণ পাওয়ার কথা জানিয়েছে তদন্ত কমিটি। ৩০ পৃষ্ঠার প্রতিবেদনে তাঁর বিরুদ্ধে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়াসহ প্রশাসনিক ও বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। পাশাপাশি ২০১৮ সালের জুলাই থেকে বিধিবহির্ভূতভাবে দেওয়া আর্থিক সুবিধার অর্থ সংশ্লিষ্ট অধ্যক্ষ ও শিক্ষকদের কাছ থেকে ফেরত নেওয়ার সুপারিশ রয়েছে। গত ৮ অক্টোবর প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়।

কলেজের সম্পত্তি ভাড়া, আয়ের হিসাব নেই

তদন্তে কলেজের সম্পত্তি ব্যবস্থাপনায় গভর্নিং বডির অনুমোদন উপেক্ষার বিষয়টি উঠে এসেছে। কমিটির পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, গভর্নিং বডিকে না জানিয়ে অর্থের বিনিময়ে বহিরাগত একটি পরিবারকে কলেজ প্রাঙ্গণে বসবাসের সুযোগ দেওয়া হয়। একইভাবে কলেজের শ্রেণিকক্ষ ও অডিটোরিয়ামও ভাড়ার বিনিময়ে ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু এসব খাত থেকে পাওয়া অর্থ কলেজের তহবিলে জমা দেওয়ার কোনো রসিদ বা ভাউচার দেখাতে পারেননি অধ্যক্ষ।

কলেজের সম্পত্তি ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া থেকে শুরু করে অর্থের হিসাব সংরক্ষণ পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়ায় অধ্যক্ষের প্রশাসনিক ও আর্থিক দায় রয়েছে বলে মনে করছে তদন্ত কমিটি। এ দায় নির্ধারণ করে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।

আবাসন সুবিধা নিয়েও দায়িত্ব ভাতা

অধ্যক্ষের আর্থিক সুবিধা গ্রহণ নিয়েও আপত্তি তুলেছে তদন্ত কমিটি। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কলেজের আবাসিক সুবিধা ভোগ করার পাশাপাশি দায়িত্ব ভাতার নামে অতিরিক্ত অর্থ নিয়েছেন শ্যামল কান্তি মজুমদার। সরকারি বাড়িভাড়া ভাতা ফেরত দেওয়ার স্বপক্ষেও তিনি প্রমাণ দিতে পারেননি। এ ছাড়া সরকারি মূল বেতনের ওপর নির্ধারিত ইনক্রিমেন্ট পাওয়ার পরও বিভিন্ন নামে কলেজের তহবিল থেকে একই ধরনের অতিরিক্ত সুবিধা নেওয়ার প্রমাণ পেয়েছে কমিটি।

শিক্ষকদের বেতন-ভাতাতেও অনিয়ম

শিক্ষকদের বেতন-ভাতা নির্ধারণেও নিয়ম মানা হয়নি বলে তদন্তে উঠে এসেছে। এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের ইনসেনটিভ, প্রফেশনাল ইনক্রিমেন্ট ও অতিরিক্ত কলেজ বেতন দেওয়ার ক্ষেত্রে গভর্নিং বডির অনুমোদন, কলেজের আর্থিক সামর্থ্য, অর্থের উৎস এবং প্রযোজ্য বিধিবিধান যথাযথভাবে বিবেচনা করা হয়নি। একই ধরনের সুবিধা শিক্ষকদের মধ্যে ভিন্ন ভিন্ন হারে নির্ধারণের বিষয়টিও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এ অবস্থায় ২০১৮ সালের জুলাই থেকে এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের কলেজ তহবিল থেকে দেওয়া ইনক্রিমেন্ট, ইনসেনটিভ ও প্রফেশনাল ইনক্রিমেন্টের হিসাব করতে বলেছে তদন্ত কমিটি। যে নামেই এসব অর্থ দেওয়া হয়ে থাকুক, বিধিবহির্ভূত অর্থ সংশ্লিষ্ট অধ্যক্ষ ও শিক্ষকদের কাছ থেকে চালানের মাধ্যমে ফেরত নিয়ে কলেজের তহবিলে জমা দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।

দুই শিক্ষকের অর্থ ফেরতের সুপারিশ

শিক্ষক নিয়োগ ও পদোন্নতির বিষয়েও আপত্তি তুলেছে তদন্ত কমিটি। কাম্য শিক্ষাগত যোগ্যতা না থাকা সত্ত্বেও খণ্ডকালীন প্রভাষক হিসেবে কর্মরত মনির আহমেদকে চাকরি থেকে বরখাস্তের সুপারিশ করা হয়েছে। তবে অফিস সহকারী কাম হিসাব সহকারী বা সমমানের পদে নন-এমপিও বেতন হিসেবে যে অর্থ পাওয়ার কথা, তা বাদ দিয়ে অবশিষ্ট অবৈধভাবে উত্তোলিত অর্থ তাঁর কাছ থেকে অনাদায়ি পাওনা হিসেবে আদায়ের সুপারিশ করা হয়েছে।

অন্যদিকে, নন-এমপিও প্রভাষক রাশেদ মোকাম্মেলকে জ্যেষ্ঠ প্রভাষক পদে প্রাতিষ্ঠানিক পদোন্নতির বিপরীতে কলেজের তহবিল থেকে দেওয়া অতিরিক্ত অর্থ ফেরত নিতে বলা হয়েছে। এককালীন অথবা বেতন থেকে সমন্বয়ের মাধ্যমে ওই অর্থ কলেজের তহবিলে জমা দেওয়ার সুপারিশ করেছে কমিটি।

অতিরিক্ত ভর্তি ফি নেওয়ার অভিযোগ প্রমাণিত

হিসাববিজ্ঞান বিষয়ের প্রভাষক সালাউদ্দিন কাদেরের বিরুদ্ধেও অনিয়মের প্রমাণ পাওয়ার কথা জানিয়েছে তদন্ত কমিটি। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে বিধিবহির্ভূতভাবে অতিরিক্ত ভর্তি ফি নেওয়ার অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে। এ ছাড়া অধ্যক্ষের সঙ্গে যোগসাজশ করে ইচ্ছেমতো বেতন বিল তৈরি এবং অবৈধ আর্থিক সুবিধা নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে।

তবে একই কলেজের নন-এমপিও শিক্ষকদের বেতন-ভাতা নিয়ে ভিন্ন চিত্র উঠে এসেছে তদন্তে। বিধি মোতাবেক নিয়োগ পাওয়া এসব শিক্ষক জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধি অনুযায়ী প্রাপ্য বেতন-ভাতা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এ বৈষম্য দূর করতে সংশ্লিষ্ট পক্ষকে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার সুপারিশ করেছে কমিটি।

ছাত্রীর প্রতি কুপ্রস্তাবের অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি

অন্যদিকে, শিক্ষক মো. মিজানুর রহমান চৌধুরীর বিরুদ্ধে এক ছাত্রীকে কুপ্রস্তাব দেওয়ার অভিযোগের সত্যতা পায়নি তদন্ত কমিটি। অধ্যক্ষের উত্থাপিত এ অভিযোগের পক্ষে পর্যাপ্ত, প্রত্যক্ষ ও নির্ভরযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

কমিটি জানায়, কথিত ভুক্তভোগী, মূল অভিযোগকারী ও সাক্ষীদের বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি। এ ছাড়া দাখিল করা ডিজিটাল উপাত্ত ও লিখিত বক্তব্যের সত্যতাও যাচাই করা যায়নি। ফলে অভিযোগটি প্রমাণিত হয়নি বলে মত দিয়েছে তদন্ত কমিটি।

অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা চায় তদন্ত কমিটি

সব মিলিয়ে বিধিবহির্ভূত সিদ্ধান্ত গ্রহণ, গভর্নিং বডির আইনগত এখতিয়ার লঙ্ঘন, আর্থিক ব্যবস্থাপনায় অনিয়ম এবং দায়িত্ব পালনে ক্ষমতার অপব্যবহারের বিষয়গুলো বিবেচনায় নিয়ে অধ্যক্ষ শ্যামল কান্তি মজুমদারের বিরুদ্ধে প্রযোজ্য আইন, বিধিবিধান ও চাকরির শর্ত অনুযায়ী প্রশাসনিক ও বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করেছে তদন্ত কমিটি।

মাউশি চট্টগ্রাম অঞ্চলের পরিচালক অধ্যাপক ফজলুল কাদের চৌধুরী বলেন, ঢাকা থেকে বিষয়টি তদন্তের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল। পরে গুরুত্বসহকারে তদন্ত করে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে প্রতিবেদন পাঠানো হয়েছে। এ বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ সিদ্ধান্ত জানাবেন।

মন্তব্য

এখনো কেউ মন্তব্য করেননি। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।

আপনার মতামত লিখুন

০/২০০০