আসন্ন পবিত্র রমজানকে সামনে রেখে ভোজ্যতেল, চিনি, ছোলা, মসুর ডাল ও খেজুরের আমদানি বেড়েছে। এসব পণ্যের ঋণপত্র (এলসি) খোলার পরিমাণেও অগ্রগতি হয়েছে। গত বছরের একই সময়ের তুলনায় আমদানি বৃদ্ধির এই চিত্র রমজানে বাড়তি চাহিদা মেটানোর ক্ষেত্রে ইতিবাচক ইঙ্গিত দিচ্ছে। তবে বাজার স্থিতিশীল রাখতে আন্তর্জাতিক বাজারের দাম, আমদানি ব্যয় ও শুল্ক পরিস্থিতির ওপর নজর রাখার প্রয়োজনীয়তার কথা জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
সোমবার (২৬ অক্টোবর) বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজার পরিস্থিতি পর্যালোচনা সভায় এসব তথ্য তুলে ধরা হয়। বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, আমদানি বাড়ার পাশাপাশি স্থানীয় বাজারে ডিম, ব্রয়লার মুরগি ও মসুর ডালের দাম কমেছে। অন্যদিকে, ভোজ্যতেল ও চিনির দাম রয়েছে স্থিতিশীল। সভায় সভাপতিত্ব করেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। রমজানে পণ্যের পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করা, দাম স্থিতিশীল রাখা এবং আমদানি ও শুল্কসংক্রান্ত জটিলতা নিরসনের বিষয়েও আলোচনা হয়।
আমদানি ও এলসি খোলায় এগিয়ে নিত্যপণ্য
বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের তথ্য বলছে, চলতি অর্থবছরের ১ জুলাই থেকে ২৫ অক্টোবর পর্যন্ত ভোজ্যতেল, চিনি, ছোলা, মসুর ডাল ও খেজুরের আমদানি গত বছরের একই সময়ের তুলনায় বেড়েছে।
এই সময়ে দেশে মোট ৮ লাখ ২৩ হাজার মেট্রিক টন ভোজ্যতেল আমদানি হয়েছে। গত বছরের একই সময়ে এর পরিমাণ ছিল ৭ লাখ ৫ হাজার মেট্রিক টন। অর্থাৎ আমদানি বেড়েছে ১ লাখ ১৮ হাজার মেট্রিক টন। এদিকে, ভোজ্যতেলের এলসি খোলার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৮ লাখ ৫ হাজার মেট্রিক টনে, যা আগের বছরের তুলনায় ১ লাখ ৩১ হাজার মেট্রিক টন বেশি। এ সময়ে সয়াবিন বীজ আমদানি হয়েছে ৫ লাখ ১ হাজার মেট্রিক টন, যা গত বছরের তুলনায় ১ লাখ ১৩ হাজার মেট্রিক টন বেশি।
চিনির আমদানিও বেড়েছে। চলতি অর্থবছরের ২৫ অক্টোবর পর্যন্ত ৬ লাখ ৮৭ হাজার মেট্রিক টন চিনি আমদানি হয়েছে, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ১ লাখ ৫৩ হাজার মেট্রিক টন বেশি। চিনির এলসি খোলার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৮ লাখ ১০ হাজার মেট্রিক টনে।
রমজানে ইফতারের অন্যতম উপকরণ ছোলার আমদানিতে উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে। গত বছরের একই সময়ে ১২ হাজার মেট্রিক টন ছোলা আমদানি হলেও চলতি অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮২ হাজার মেট্রিক টনে। অর্থাৎ আমদানি বেড়েছে ৭০ হাজার মেট্রিক টন। এ সময়ে ছোলার এলসি খোলা হয়েছে ১ লাখ ৩৮ হাজার মেট্রিক টনের।
একই সময়ে মসুর ডাল আমদানি হয়েছে ১ লাখ ২২ হাজার মেট্রিক টন, যা গত বছরের তুলনায় ৬৪ হাজার মেট্রিক টন বেশি। মসুর ডালের এলসি খোলার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ১৪ হাজার মেট্রিক টনে। অন্যদিকে, খেজুর আমদানি হয়েছে ১১ হাজার মেট্রিক টন। গত বছরের একই সময়ে আমদানির পরিমাণ ছিল ৪ হাজার মেট্রিক টন।
ডিম, মুরগি ও ডালের দাম কমেছে
ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) তথ্য অনুযায়ী, গত এক মাসে খুচরা বাজারে ডিমের দাম ৭ দশমিক ৬২ শতাংশ কমেছে। বর্তমানে প্রতি হালি ডিম বিক্রি হচ্ছে ৪৭ থেকে ৫০ টাকায়। একই সময়ে ব্রয়লার মুরগির দাম কমেছে ২ দশমিক ৬৩ শতাংশ। বর্তমানে প্রতি কেজি ব্রয়লার মুরগির দাম ১৮০ থেকে ১৯০ টাকা।
বড় দানার মসুর ডালের দামও নিম্নমুখী। গত এক মাসে এ ডালের দাম কমেছে ২ দশমিক ৫৬ শতাংশ। গত বছরের একই সময়ের তুলনায় কমেছে ৭ দশমিক ৩২ শতাংশ। বর্তমানে প্রতি কেজি বড় দানার মসুর ডাল বিক্রি হচ্ছে ৯০ থেকে ১০০ টাকায়। মাঝারি দানার মসুর ডালের দামও গত বছরের তুলনায় ৯ দশমিক ৬২ শতাংশ কমেছে।
অন্যদিকে, বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম অপরিবর্তিত রয়েছে। প্রতি লিটার সয়াবিন তেল বিক্রি হচ্ছে ২০৪ টাকায় এবং পাঁচ লিটারের বোতলের দাম ১ হাজার টাকা। চিনির দামও স্থিতিশীল রয়েছে। প্রতি কেজি চিনি বিক্রি হচ্ছে ১১০ থেকে ১১৫ টাকায়। সাধারণ মানের খেজুরের দাম গত এক মাসে তেমন পরিবর্তন হয়নি। মানভেদে প্রতি কেজি খেজুরের দাম ৩৫০ থেকে ৫৫০ টাকা।
রমজানে ডিম-মুরগির সরবরাহ নিয়ে যা বলছেন খাতসংশ্লিষ্টরা
সভায় পোল্ট্রি খাতের প্রতিনিধিরা জানান, দেশে বর্তমানে ডিম ও মুরগির উৎপাদন পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে। খামার পর্যায়ে ডিমের দাম কিছুদিন আগেও প্রতি পিস সাড়ে ১১ টাকা ছিল। এখন তা কমে ১০ টাকার নিচে নেমেছে, যা উৎপাদন খরচের কাছাকাছি।
তাঁদের মতে, খামারে রোগবালাইয়ের উল্লেখযোগ্য প্রকোপ না থাকায় ডিম ও মুরগির উৎপাদন এবং সরবরাহে বড় ধরনের ঘাটতির আশঙ্কা নেই। রমজানে সকালের নাশতার ধরনে পরিবর্তন আসায় ডিমের চাহিদা কিছুটা কমতে পারে। তবে ঈদের পর মুরগির চাহিদা বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে, যা বাজারদরে প্রভাব ফেলতে পারে।
প্রতিনিধিরা আরও জানান, বর্তমান আমদানি নীতি অনুযায়ী সরকারের বিশেষ অনুমতি ছাড়া ডিম ও মাংস আমদানি করা যায় না।
খেজুর আমদানির শুল্ক সহজ করার ওপর জোর
রমজানের আগে খেজুরের সরবরাহ ও দাম সহনীয় রাখতে আমদানি শুল্কের কাঠামো সহজ, স্বচ্ছ ও যৌক্তিক করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির।
সভায় তিনি বলেন, মিশর, সৌদি আরব, ইরাক ও আলজেরিয়াসহ প্রায় এক ডজন দেশ থেকে বিভিন্ন জাত ও মানের খেজুর আমদানি করা হয়। এসব খেজুরের গুণগত মান ও দামে পার্থক্য থাকায় একই পদ্ধতিতে শুল্কায়ন করলে জটিলতা তৈরি হতে পারে। তাই আমদানিকারকদের জন্য সহজবোধ্য ও বাস্তবসম্মত শুল্কব্যবস্থা প্রয়োজন। শুল্ক নির্ধারণের দায়িত্ব জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) হলেও কার্যকর সমাধানের জন্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর সমন্বয় জরুরি।
খেজুরের প্রচলিত শুল্ক সুবিধা দ্রুত কার্যকর করার বিষয়েও সভায় আলোচনা হয়। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, এ সুবিধা বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় অভ্যন্তরীণ প্রস্তুতি ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। পাশাপাশি নির্দিষ্ট একটি মূল্য ধরে শুল্ক নির্ধারণের পরিবর্তে খেজুরের প্রকৃত গুণগত মান ও আমদানি মূল্যের ভিত্তিতে কর নির্ধারণের প্রস্তাবও আলোচনায় আসে।
আমদানিকারকদের দাবি, সাধারণ মানের খেজুরের প্রকৃত আমদানি মূল্যের সঙ্গে শুল্কায়নের মূল্য সামঞ্জস্যপূর্ণ না হলে শুল্ক ও আমদানি ব্যয় বেড়ে যায়। এর সঙ্গে আঞ্চলিক পরিস্থিতি, বিকল্প পরিবহনপথ ব্যবহার, বাড়তি পরিবহন ও সরবরাহ ব্যয় এবং এলসি খোলার জটিলতা যুক্ত হলে বাজারে পণ্য সরবরাহেও চাপ তৈরি হতে পারে। ফল আমদানিকারকেরাও উচ্চ করহারের কারণে সাধারণ ভোক্তাদের ক্রয়ক্ষমতা বিবেচনায় ফল আমদানির কর কাঠামো আরও সহনশীল করার দাবি জানিয়েছেন। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এসব সমস্যা সমাধানে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছে।
আন্তর্জাতিক বাজারের দামের দিকেও নজর
বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের পর্যালোচনায় বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক বাজারে ভোজ্যতেল ও ছোলার দাম কিছুটা বেড়েছে। তবে কমেছে মসুর ডালের দাম। এ পরিস্থিতিতে আমদানি ব্যয়, আন্তর্জাতিক বাজারের গতিপ্রকৃতি এবং দেশের অভ্যন্তরীণ সরবরাহ পরিস্থিতি নিয়মিত পর্যবেক্ষণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
সভায় জানানো হয়, ছোলা ও মসুর ডাল আমদানিতে বর্তমানে শুল্ক-কর নেই। তবে চিনি ও ফল আমদানির শুল্ক কাঠামো পর্যালোচনা করে যৌক্তিক পরিবর্তন আনা গেলে বাজারে দাম সহনীয় রাখতে সহায়তা হতে পারে। এ ছাড়া সাম্প্রতিক সময়ে স্থানীয় বাজারে তাজা ফলের দামও কিছুটা কমেছে।
সভায় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব শরফ উদ্দিন আহমদ চৌধুরী, বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের চেয়ারম্যান নাসির উদ দৌলা, জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. জহিরুল ইসলামসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও বিভিন্ন খাতের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
নিত্যপণ্যের আমদানি বৃদ্ধি, কয়েকটি পণ্যের দাম কমে আসা এবং ডিম-মুরগির সরবরাহ স্বাভাবিক থাকার প্রত্যাশা রমজানের বাজার নিয়ে ইতিবাচক ইঙ্গিত দিচ্ছে। তবে বাজারে স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে আমদানি ব্যয়, আন্তর্জাতিক বাজারের দাম ও শুল্কসংক্রান্ত বিষয়গুলো কতটা কার্যকরভাবে সামাল দেওয়া যায়, তার ওপরও পরিস্থিতি নির্ভর করবে।









মন্তব্য
এখনো কেউ মন্তব্য করেননি। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।