জুলাই অভ্যুত্থানে চট্টগ্রামের প্রথম শহীদ ছাত্রদল নেতা মো. ওয়াসিম আকরাম হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার হয়েছিলেন একেএম জিয়াউদ্দিন। বর্তমানে তিনি জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) চট্টগ্রাম মহানগর আহ্বায়ক কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক। কমিটিতে তাঁর নাম রয়েছে ‘জিয়া রনি’ হিসেবে। একাধিক নথি পর্যালোচনা করে নিশ্চিত হওয়া গেছে, একেএম জিয়াউদ্দিন ও জিয়া রনি একই ব্যক্তি।
২০২৫ সালের ২৩ জুন একেএম জিয়াউদ্দিনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। জামিনে মুক্তির পর ২০২৬ সালের ১৪ মে তিনি এনসিপির চট্টগ্রাম মহানগর আহ্বায়ক কমিটিতে যুগ্ম আহ্বায়কের পদ পান।
২০২৪ সালের ১৬ জুলাই চট্টগ্রামের মুরাদপুর এলাকায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের বিক্ষোভে অংশ নিয়ে গুলিবিদ্ধ হন ছাত্রদল নেতা ওয়াসিম আকরাম। পরে হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। অভ্যুত্থানের পর ১৮ আগস্ট তাঁর হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় নগরীর পাঁচলাইশ মডেল থানায় মামলা করেন নিহতের মা মোসাম্মৎ জোসনা আক্তার। মামলার নম্বর ১৮।
মামলার পঞ্চম তদন্ত কর্মকর্তা নুরুজ্জামান জানান, এ পর্যন্ত এ মামলায় ১৪০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
জুলাই অভ্যুত্থানের পর বিভিন্ন মামলায় গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের অব্যাহতি দিতে বাদীপক্ষের সুপারিশের ঘটনা ঘটেছে। ওয়াসিম হত্যা মামলায় এ ধরনের কোনো আবেদন আদালতে জমা পড়েছে কি না, জানতে চাইলে তদন্ত কর্মকর্তা নুরুজ্জামান বলেন, ‘না, এ ধরনের কোনো আবেদন দেওয়া হয়নি। গ্রেপ্তারকৃত কেউ মামলা থেকে বাদ গেছেন, এমন হয়নি এখন পর্যন্ত।’
তদন্ত প্রতিবেদন কবে নাগাদ জমা দেওয়া হতে পারে, জানতে চাইলে তিনি বলেন, এটি নিশ্চিতভাবে বলতে পারছি না। ফরেনসিকের কিছু কাজ আছে। শেষ হলে দিয়ে দেব।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে একেএম জিয়াউদ্দিন প্রথমে বলেন, এই মামলায় আমাকে চার্জশিট থেকে বাদ দিয়েছে।
তাঁকে জানানো হয়, মামলার চার্জশিট এখনো দাখিল হয়নি। তখন তিনি বলেন, ইন্টেরিমের সময় এসব নিয়ে কি আইন হয়েছিল না। সেগুলোতে আমি বাদ গেছি। আমার আইনজীবী এই বিষয়ে জানে।
একপর্যায়ে তিনি বলেন, আপনি কীভাবে নিশ্চিত হলেন আমি এই মামলায় গ্রেপ্তার হয়েছি। নিশ্চিত হলে আপনি লিখে দেন। এর পরে আমার যা করার আমি তা করব। আপনার সঙ্গে এই বিষয়ে কথা বলতে আমি ইন্টারেস্টেড না। বাধ্যও না।
চট্টগ্রামে এনসিপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত একাধিক নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছে, কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার আগে একেএম জিয়াউদ্দিন ওরফে জিয়া রনির দলীয় সম্পৃক্ততা সম্পর্কে তাদের জানা ছিল না।
২০২৬ সালের ১৪ মে এনসিপির চট্টগ্রাম মহানগর আহ্বায়ক কমিটি অনুমোদন দেওয়া হয়। এতে স্বাক্ষর করেন দলের সদস্যসচিব আখতার হোসেন এবং মুখ্য সংগঠক (দক্ষিণাঞ্চল) মো. আবুল হাসনাত। অনুমোদিত কমিটির যুগ্ম আহ্বায়কদের তালিকায় রয়েছে জিয়া রনির নাম।
কমিটির প্রথম পাতায় আহ্বায়ক, দুই সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক ও ১৫ জন যুগ্ম আহ্বায়কের নাম রয়েছে। অন্যদের পূর্ণ নাম ও মোবাইল নম্বর দেওয়া থাকলেও জিয়া রনির নামের পাশে কোনো মোবাইল নম্বর উল্লেখ নেই।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এনসিপির একজন নেতা বলেন, ওই কমিটির তালিকা দেখলেই বোঝা যায় শেষ মুহূর্তে তড়িঘড়ি করে তার নামটা বসিয়ে দেওয়া হয়েছে। এর আগে তাকে সেভাবে চিনতামও না।
অনুসন্ধানে পাওয়া মামলা ও পুলিশের নথি অনুযায়ী, সাবেক যুবলীগ সমর্থক হিসেবে পরিচিত এবং ওয়াসিম হত্যা মামলার আসামি একেএম জিয়াউদ্দিনই এনসিপির কমিটির জিয়া রনি।
ওয়াসিম হত্যা মামলা নিয়ে কথা হয় শহীদের বাবা শফিউল আলমের সঙ্গে। তিনি বলেন, আমাদেরকে সবাই বলির পাঁঠা বানিয়েছে। কতজন কতভাবে যে আমাদের নিয়ে ব্যবসা করেছে। কতভাবে প্রতারণা করেছে। এগুলো নিয়ে আর কথা বলতে চাই না। শুধু এটুকু বলব, আমার ছেলের হত্যার বিচারটা যেন ঠিকভাবে হয়। যারা দোষী না, তাদের হয়রানি যেন না করা হয়।
তিনি আরও বলেন, একবার ঢাকা যাওয়ার পর একজন পথে এনসিপির অফিস দেখাল। ভাবলাম আমার ছেলের জন্য তারা এত কিছু করেছে। একটু দেখা করে আসি। সেটার ভিডিও করে তারা প্রচার করেছে আমি এনসিপিতে যোগ দিয়েছি। অথচ আমি কোনো দলের বিষয়ে আগ্রহী না। এলাকার সন্তান হিসেবে সালাউদ্দিন আহমেদের প্রতি ভালোবাসা আছে। এর বেশি কিছু না। ওদের নিয়ে কিছু বলতে চাই না।
এ বিষয়ে চট্টগ্রাম মহানগর ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক জহির উদ্দিন বাবর বলেন, রাজপথে জুলাইয়ের প্রথম দিকের একজন শহীদ ছাত্রদলের ওয়াসিম। সেই হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে জেল খাটা একজনকে দলীয় পদ দেওয়ার মধ্য দিয়ে এনসিপি জুলাইয়ের সঙ্গে গাদ্দারি করল। অথচ তারা দাবি করে জুলাইয়ের গুরুত্বপূর্ণ স্টেকহোল্ডার তারা। এনসিপির শীর্ষ নেতারা এই বিষয়ে জাতিকে ব্যাখ্যা দেবে, এটাই আমাদের দাবি।
জুলাইয়ের একজন শহীদের হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তির এনসিপিতে পদ পাওয়ার বিষয়ে কথা হয় দলের সাংগঠনিক সম্পাদক এস এম সুজা উদ্দিনের সঙ্গে। তিনি বলেন, ওই মামলায় তার (জিয়াউদ্দিন) নামে কোনো চার্জশিট হয়নি। তবে এ বিষয়ে বারবার নানা কথা আসছে, দলের মহানগর কমিটি এবং তার আইনজীবীর সঙ্গে কথা বলে বিস্তারিত জানানো যাবে।
তিনি আরও বলেন, আগের কিছু ব্যবসার সুবাদে অনেকের সঙ্গে তার ছবি থাকতে পারে। তবে এ বিষয়ে স্পষ্ট কোনো তথ্য এখনো হাতে আসেনি। দীর্ঘদিন ধরে প্রোপাগান্ডা চালিয়ে আওয়ামী লীগের বিভিন্ন লোকজন তাকে হেনস্তা করার চেষ্টা করেছে।









মন্তব্য
এখনো কেউ মন্তব্য করেননি। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।