বাংলাদেশে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার গঠনের পর রাজনৈতিক পরিস্থিতি আগের তুলনায় স্থিতিশীল হয়েছে এবং রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনাও কমেছে বলে উল্লেখ করেছে যুক্তরাজ্য সরকার। তবে দুর্নীতি, পুলিশের জবাবদিহি, মানবাধিকার সুরক্ষা ও সংস্কার বাস্তবায়ন নিয়ে এখনো উদ্বেগ রয়েছে।
মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) যুক্তরাজ্যের স্বরাষ্ট্র দপ্তর প্রকাশিত বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিবিষয়ক এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। ‘রিপোর্ট অব আ ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং মিশন বাংলাদেশ: পলিটিক্যাল সিচুয়েশন, অক্টোবর ২০২৬’ শীর্ষক প্রতিবেদনটি তৈরি করেছে দেশটির কান্ট্রি পলিসি অ্যান্ড ইনফরমেশন টিম (সিপিআইটি)।
প্রতিবেদনটি তৈরির অংশ হিসেবে গত ৭ থেকে ১৫ জুন বাংলাদেশ সফর করেন সিপিআইটির তিন কর্মকর্তা। এ সময় তাঁরা রাজনৈতিক দল, পুলিশ, মানবাধিকার সংগঠন, নাগরিক সমাজ, সাংবাদিক, গবেষক ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের সঙ্গে কথা বলেন। তাঁদের সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি মূল্যায়ন করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণ-অভ্যুত্থান, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কাল এবং ২০২৬ সালের নির্বাচনের পর বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার গঠনের মধ্য দিয়ে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে সামগ্রিক স্থিতিশীলতা এসেছে। ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনকে বিভিন্ন সূত্র সাধারণভাবে শান্তিপূর্ণ এবং আগের নির্বাচনগুলোর তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম সহিংস বলে বর্ণনা করেছে।
নির্বাচনের পর রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনাও কমেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এ ধরনের ঘটনা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। যেসব সহিংসতার খবর পাওয়া যাচ্ছে, তার বেশির ভাগই স্থানীয় পর্যায়ে প্রভাব বিস্তার, ব্যবসায়িক স্বার্থ, সম্পদ নিয়ন্ত্রণ ও রাজনৈতিক আধিপত্যকে কেন্দ্র করে ঘটছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
যুক্তরাজ্যের স্বরাষ্ট্র দপ্তরের মূল্যায়ন অনুযায়ী, আগের আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ের তুলনায় বর্তমানে রাজনৈতিক দল, সাংবাদিক, নাগরিক সমাজ ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মত প্রকাশ এবং সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালনার সুযোগ বেড়েছে। জনপরিসরে বিতর্কে অংশ নেওয়ার ক্ষেত্রেও তারা তুলনামূলক বেশি স্বাধীনতা পাচ্ছে।
প্রতিবেদনে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ (এনসিপি) বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের কার্যক্রমের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এসব দল সংগঠিত হওয়া, প্রচার চালানো, বিক্ষোভ করা এবং সরকারের সমালোচনা করতে পারছে বলে জানানো হয়েছে।
অন্যদিকে, ক্ষমতায় থাকাকালে মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং ২০২৪ সালের জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থানকে ঘিরে সংঘটিত ঘটনাবলির কারণে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে দলটির যেসব নেতা-কর্মী দুর্নীতি, সহিংসতা বা দমন-পীড়নের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না, তাঁদের অনেকে নিজ নিজ এলাকায় অবস্থান করতে পারছেন। যদিও প্রকাশ্যে আওয়ামী লীগের সমর্থনে বক্তব্য দেওয়ার কারণে তাঁদের কেউ কেউ হয়রানি, সামাজিক বিরূপতা বা সহিংসতার শিকার হতে পারেন বলে প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে।
রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে উন্নতির কথা বলা হলেও দুর্নীতি, পুলিশের জবাবদিহি এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কার্যকারিতা নিয়ে উদ্বেগের বিষয়টি তুলে ধরেছে যুক্তরাজ্যের স্বরাষ্ট্র দপ্তর।
বাংলাদেশের পুলিশ সূত্রের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বা মিথ্যা হিসেবে বিবেচিত ২১ হাজারের বেশি মামলা প্রত্যাহার করা হয়েছে। পাশাপাশি পুরোনো মামলাগুলো পর্যালোচনার কাজও চলছে।
সাবেক আওয়ামী লীগ সরকারের সময় দায়ের হওয়া রাজনৈতিক মামলাগুলোর একটি বড় অংশ প্রত্যাহার করা হলেও দলটির বহু নেতা-কর্মী ও সাবেক কর্মকর্তা এখনো ফৌজদারি মামলার মুখোমুখি রয়েছেন। ২০২৪ সালের জুলাইয়ের আন্দোলনের সময়কার কর্মকাণ্ডসহ বিভিন্ন অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ও সাধারণ আদালতে তাঁদের বিচার চলছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, এসব মামলায় কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তি জামিনে মুক্তি পেয়েছেন। অন্যদিকে, অনেকে এখনো বিচারাধীন অবস্থায় আটক রয়েছেন।









মন্তব্য
এখনো কেউ মন্তব্য করেননি। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।