মূল লেখায় যান
শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর ২০২৬ · ৭ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
শিরোনাম
প্রিয় চট্টগ্রাম

এনসিটি হস্তান্তর ঘিরে চট্টগ্রাম বন্দরে উত্তেজনা

দীর্ঘ আলোচনা, দর-কষাকষি ও আইনি জটিলতা পেরিয়ে চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) পরিচালনার দায়িত্ব বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে দেওয়ার প্রক্রিয়া চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক বন্দর পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ডে

এনসিটি হস্তান্তর ঘিরে চট্টগ্রাম বন্দরে উত্তেজনা

দীর্ঘ আলোচনা, দর-কষাকষি ও আইনি জটিলতা পেরিয়ে চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) পরিচালনার দায়িত্ব বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে দেওয়ার প্রক্রিয়া চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক বন্দর পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ডের সাথে এনসিটি পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ নিয়ে বৃহস্পতিবার ৮ অক্টোবর চুক্তি সই হওয়ার কথা রয়েছে।

তবে চুক্তির আইনি বাধা কেটে গেলেও জাতীয় স্বার্থ, অর্থনৈতিক প্রভাব, শ্রমিক অধিকার ও জনমত উপেক্ষার অভিযোগ তুলে এর বিরোধিতা করছে বন্দর রক্ষা কমিটি, শ্রমিক সংগঠনসহ বিভিন্ন পক্ষ। একই সময়ে বন্দরের ছবি-ভিডিও ও অপারেশনাল তথ্য প্রকাশে নিষেধাজ্ঞা নিয়েও সাংবাদিক সংগঠনগুলোর মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

এর আগে ১ অক্টোবর এনসিটি ও এর সাথে সংযুক্ত ওভারফ্লো কনটেইনার ইয়ার্ড (ওসিওয়াই) ১৫ বছরের জন্য আন্তর্জাতিক অপারেটরের মাধ্যমে পরিচালনার লক্ষ্যে কনসেশন চুক্তির খসড়ায় নীতিগত অনুমোদন দেওয়া হয়। নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের ‘অপারেশন অ্যান্ড মেইনটেন্যান্স অব সিপিএস নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল, ইনক্লুডিং ওভারফ্লো কনটেইনার ইয়ার্ড’ শীর্ষক পিপিপি প্রকল্পের আওতায় এ প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।

আইনি বাধা কেটেছে

এনসিটি পরিচালনায় বিদেশি অপারেটর নিয়োগের বৈধতা নিয়ে তৈরি হওয়া আইনি জটিলতাও এরই মধ্যে কেটে গেছে। চলতি বছরের ২৯ জানুয়ারি বিচারপতি জাফর আহমেদের একক হাইকোর্ট বেঞ্চ রিটের রুল খারিজ করেন। এর ফলে সংখ্যাগরিষ্ঠ মতের ভিত্তিতে বিদেশি কোম্পানির সাথে এনসিটি পরিচালনার চুক্তি-প্রক্রিয়া বৈধতা পায়।

রায়ে আদালত বলেন, ডিপি ওয়ার্ল্ডের সাথে পিপিপি কর্তৃপক্ষের সমঝোতা স্মারক আইনগতভাবেই হয়েছে এবং কার্যক্রম ২০১৭ সালের প্রকিউরমেন্ট পলিসি ও সংশ্লিষ্ট সমঝোতা স্মারকের অধীনে এগোচ্ছে। নীতিমালায় সরাসরি বাছাই বা নির্বাচনের পাশাপাশি দরপত্রের ব্যবস্থাও রয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আইনগত ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে বলেও আদালতের পর্যবেক্ষণে উল্লেখ করা হয়।

চট্টগ্রাম বন্দরের চারটি সচল কনটেইনার টার্মিনালের মধ্যে এনসিটি সবচেয়ে বড়। গত বছর বন্দরের মোট কনটেইনার পরিবহনের প্রায় ৪৪ শতাংশ এ টার্মিনালের মাধ্যমে হয়েছে। ২০২৪ সালের ৭ জুলাই থেকে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর নিয়ন্ত্রণাধীন রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান চিটাগং ড্রাইডক লিমিটেড এনসিটি পরিচালনা করছে। বিদেশি অপারেটরের কাছে দায়িত্ব হস্তান্তর না হওয়া পর্যন্ত তারাই টার্মিনালটি পরিচালনা করবে।

বন্দরের অন্য তিনটি প্রধান টার্মিনালের মধ্যে জেনারেল কার্গো বার্থ (জিসিবি) ও চিটাগং কনটেইনার টার্মিনাল (সিসিটি) দেশীয় অপারেটরের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনাল পরিচালনা করছে সৌদি আরবভিত্তিক রেড সি গেটওয়ে টার্মিনাল ইন্টারন্যাশনাল (আরএসজিটিআই)।

শুরু থেকেই বিরোধিতা

এনসিটি পরিচালনায় ডিপি ওয়ার্ল্ডকে যুক্ত করার উদ্যোগ শুরু হয়েছিল আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে পিপিপি ও জিটুজি কাঠামোয়। পরবর্তী সময়ে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে দর-কষাকষি এগোলেও শ্রমিক আন্দোলনের মধ্যে গত ফেব্রুয়ারিতে প্রক্রিয়াটি স্থগিত হয়। নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর গত জুনে ডিপি ওয়ার্ল্ডের সাথে আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হলে প্রক্রিয়াটি আবার গতি পায়।

১ অক্টোবর কনসেশন চুক্তির খসড়া অনুমোদনের পর বন্দর রক্ষা কমিটি, শ্রমিক সংগঠনসহ বিভিন্ন পক্ষ এর বিরোধিতা করে আসছে। তাদের দাবি, জাতীয় স্বার্থ ও অর্থনৈতিক প্রভাবের পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়ন ছাড়া এনসিটি বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে দেওয়া উচিত নয়।

চুক্তি বাতিলের দাবিতে ৫ অক্টোবর বন্দর ভবনের সামনে অবস্থান কর্মসূচি পালন করে বন্দর রক্ষা কমিটি। চুক্তি হলে বন্দর কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়ারও হুঁশিয়ারি দেন আন্দোলনকারীরা। জনমত উপেক্ষা করে চুক্তি করা হলে তা ইতিহাসে ‘কালো চুক্তি’ হিসেবে চিহ্নিত হবে বলে মন্তব্য করেন তারা।

বুধবার ৭ অক্টোবর দেওয়া এক বিবৃতিতে বন্দর রক্ষা কমিটির আহ্বায়ক প্রকৌশলী দেলোয়ার মজুমদার ও সদস্যসচিব ফজলুল কবির মিন্টু বলেন, জাতীয় স্বার্থের সাথে সরাসরি সম্পর্কিত এ চুক্তির শর্ত, পরিচালনার অধিকার, আর্থিক দায় ও শ্রমিকদের অধিকার সম্পর্কে জনগণকে স্পষ্টভাবে না জানিয়ে চুক্তি করা উদ্বেগজনক। জনমত উপেক্ষা করে এ ধরনের সিদ্ধান্ত গ্রহণযোগ্য নয় বলেও তারা মন্তব্য করেন।

বন্দরের ছবি-ভিডিওতে নিষেধাজ্ঞা

এদিকে চট্টগ্রাম বন্দরের সংবেদনশীল স্থাপনা, নিরাপত্তাব্যবস্থা ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর ছবি-ভিডিও ধারণ এবং তা গণমাধ্যম বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশে কঠোর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে বন্দর কর্তৃপক্ষ।

৬ অক্টোবর বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, পূর্বানুমোদন ছাড়া বন্দরের নিরাপত্তাব্যবস্থা, সংরক্ষিত এলাকা, নজরদারি সক্ষমতা, স্থাপনার অভ্যন্তরীণ বিন্যাস ও অপারেশনাল তথ্য ধারণ, প্রকাশ বা প্রচার বেআইনি। নির্দেশনা অমান্য করলে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও জানানো হয়।

পূর্বানুমতি ছাড়া বন্দরের প্রবেশ ও নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা, যোগাযোগ কাঠামো, সিসিটিভি ও অন্যান্য নজরদারি ব্যবস্থা, জাহাজ ও কার্গো হ্যান্ডলিং-সংক্রান্ত ছবি, ভিডিও, স্কেচ কিংবা তথ্য সংগ্রহ ও প্রচার থেকেও সবাইকে বিরত থাকতে বলা হয়েছে।

বন্দর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, চট্টগ্রাম বন্দর দেশের প্রধান সামুদ্রিক প্রবেশদ্বার। জাতীয় অর্থনীতি ও বৈদেশিক বাণিজ্যে এর গুরুত্ব বিবেচনায় নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি। বন্দরটি আন্তর্জাতিক জাহাজ ও বন্দর স্থাপনা নিরাপত্তা (আইএসপিএস) কোডের আওতায় ‘জিরো অবজারভেশন’ অর্জন করেছে বলেও বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়।

‘গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণের নির্দেশনা উদ্বেগজনক’

ছবি, ভিডিও ও অপারেশনাল তথ্য প্রকাশে নিষেধাজ্ঞার ঘটনায় উদ্বেগ জানিয়েছে চট্টগ্রাম সাংবাদিক ইউনিয়ন (সিইউজে)।

সিইউজের সভাপতি রিয়াজ হায়দার চৌধুরী ও সাধারণ সম্পাদক সবুর শুভ বলেন, বন্দরের নিরাপত্তা ও সংবেদনশীল স্থাপনা রক্ষা করা প্রয়োজন। তবে নিরাপত্তার বিষয়কে ব্যবহার করে সংবাদ সংগ্রহ, অনুসন্ধান ও প্রকাশের অধিকার নিয়ন্ত্রণ করা গ্রহণযোগ্য নয়।

তারা সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদে বাক্ ও ভাবপ্রকাশের স্বাধীনতার পাশাপাশি সংবাদক্ষেত্রের স্বাধীনতার কথা উল্লেখ করেন। তথ্য অধিকার আইন, ২০০৯-এর ৪ ধারায় নাগরিকের তথ্য পাওয়ার অধিকার এবং ৬ ধারায় কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত ও কার্যক্রমের তথ্য জনগণের জন্য সহজলভ্য করার নীতির কথাও তুলে ধরেন।

সিইউজে নেতারা বলেন, বিশেষ করে এনসিটি বিদেশি প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ডকে দেওয়ার প্রক্রিয়া নিয়ে যখন জনমনে আলোচনা, প্রশ্ন ও আন্দোলন চলছে, তখন এ ধরনের নির্দেশনা স্বাভাবিকভাবেই নানা প্রশ্ন তৈরি করছে। বন্দর পরিচালনা, চুক্তি, ইজারা, বিনিয়োগ, নিরাপত্তা, শ্রমিকস্বার্থ ও জনস্বার্থ নিয়ে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা বন্ধ করা উচিত নয়।

নিলামযোগ্য পণ্য খালাসে সময়সীমা শেষ

চট্টগ্রাম বন্দরের বিভিন্ন ইয়ার্ড, শেড ও সংরক্ষণাগারে দীর্ঘদিন পড়ে থাকা নিলাম হওয়া ও নিলামযোগ্য পণ্যচালান দ্রুত খালাসে দেওয়া সময়সীমাও শেষ হয়েছে বুধবার।

৭ অক্টোবর চট্টগ্রাম কাস্টমসের নিলাম বিভাগ থেকে জারি করা গণবিজ্ঞপ্তিতে সংশ্লিষ্ট আমদানিকারক, রপ্তানিকারক, শিপিং লাইন বা এজেন্ট, কাস্টমস ট্রেডারসহ সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোকে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রয়োজনীয় দলিল দাখিল ও পণ্য খালাসের জন্য অনুরোধ করা হয়।

নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পণ্য খালাস না হলে এবং কোনো পক্ষ বৈধ দাবি, স্বত্ব, আপত্তি বা আদালতের আদেশ উপস্থাপন করতে ব্যর্থ হলে প্রচলিত আইন অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এর মধ্যে পুনঃনিলাম, ধ্বংস বা অন্যান্য আইনানুগ নিষ্পত্তির ব্যবস্থা থাকতে পারে।

চট্টগ্রাম কাস্টমস জানিয়েছে, বন্দরের ধারণক্ষমতার সর্বোত্তম ব্যবহার, পণ্যজট কমানো, রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি এবং দীর্ঘদিন পড়ে থাকা নিলাম হওয়া ও নিলামযোগ্য পণ্য দ্রুত নিষ্পত্তির লক্ষ্যেই এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

নিউজনাউ/এসএইচআর/পিপিএন/২০২৬

মন্তব্য

এখনো কেউ মন্তব্য করেননি। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।

আপনার মতামত লিখুন

০/২০০০