দেশজুড়ে পরিবারের আর্থসামাজিক তথ্য সংগ্রহের মাধ্যমে ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি বাস্তবায়নের কার্যক্রম শুরু করেছে সরকার। সোমবার (১২ অক্টোবর) থেকে বাড়ি বাড়ি গিয়ে তথ্য সংগ্রহ শুরু হয়েছে। আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে প্রায় ৪ কোটি ৪৫ লাখ পরিবারের তথ্য সংগ্রহ করে কেন্দ্রীয় ডেটাবেইজে যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে নতুন করে ৪০ লাখ নারী পরিবারপ্রধানকে ফ্যামিলি কার্ড ও ভাতা দেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
সোমবার সচিবালয়ে তথ্য অধিদপ্তরের সম্মেলনকক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান সমাজকল্যাণ এবং মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রী অধ্যাপক ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন। এ সময় কর্মসূচির অগ্রগতি, উপকারভোগী নির্বাচনের পদ্ধতি, তথ্য সংগ্রহ এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা তুলে ধরেন তিনি।
মন্ত্রী জানান, ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির জন্য ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ১৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এর মধ্যে ১২ হাজার ৩০০ কোটি টাকা ব্যয় করা হবে ভাতা বিতরণে। কর্মসূচি বাস্তবায়নে ইতোমধ্যে ‘ফ্যামিলি কার্ড বাস্তবায়ন নীতিমালা, ২০২৬’ প্রণয়ন করা হয়েছে।
সব পরিবার কার্ড পেলেও ভাতা পাবেন তিন শ্রেণির নারী
ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির আওতায় দেশের পরিবারগুলোকে আর্থসামাজিক অবস্থার ভিত্তিতে পাঁচটি শ্রেণিতে ভাগ করা হবে। শ্রেণিগুলো হলো অতিদরিদ্র, দরিদ্র, ঝুঁকিপূর্ণ নিম্নবিত্ত, মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত। প্রতিটি পরিবারের নারীপ্রধানকে কার্ড দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে ভাতা পাবেন প্রথম তিন শ্রেণির—অতিদরিদ্র, দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ নিম্নবিত্ত পরিবারের নারীপ্রধানেরা।
সমাজকল্যাণমন্ত্রী বলেন, নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন বাড়ানো এবং পরিবারের সিদ্ধান্ত গ্রহণে তাঁদের অংশগ্রহণ ও মর্যাদা নিশ্চিত করা এ কর্মসূচির অন্যতম উদ্দেশ্য। ধর্মীয় বা রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে কাউকে বাদ দেওয়ার সুযোগ থাকবে না বলেও জানান তিনি।
উপকারভোগী নির্বাচনে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হালনাগাদ করা প্রক্সি মিন্স টেস্ট (পিএমটি) পদ্ধতি ব্যবহার করা হবে। এ পদ্ধতিতে ৮৬০ বা তার কম স্কোর পাওয়া নারী পরিবারপ্রধানেরা ভাতা পাওয়ার যোগ্য হিসেবে বিবেচিত হবেন।
পরিবারের আয় ও সম্পদ, শিক্ষাগত যোগ্যতা, জমি, বসতবাড়ি, পানি ও স্যানিটেশন সুবিধাসহ বিভিন্ন বিষয় বিবেচনায় নিয়ে পিএমটি স্কোর নির্ধারণ করা হবে। তথ্য সংগ্রহকারীরা সরাসরি কাউকে ভাতার জন্য নির্বাচন করবেন না। তাঁদের সংগ্রহ করা তথ্যের ভিত্তিতে সফটওয়্যারের মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয়ভাবে যোগ্যতা নির্ধারণ করা হবে।
তথ্য সংগ্রহে কাজ করবেন ৬৬ হাজারের বেশি কর্মী
সারা দেশে তথ্য সংগ্রহের জন্য ৬৬ হাজার ৮১৫ জন তথ্য সংগ্রহকারী এবং ৬ হাজার ৬৮১ জন সুপারভাইজার নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তাঁদের প্রথম পর্যায়ের প্রশিক্ষণও সম্পন্ন হয়েছে বলে জানান মন্ত্রী।
তথ্য সংগ্রহকারীরা বিশেষায়িত ট্যাবলেট ব্যবহার করে বাড়ি বাড়ি গিয়ে পরিবারের সদস্যদের তথ্য নেবেন। এসব তথ্য সরাসরি অনলাইন ডেটাবেইজে সংরক্ষিত হবে। পুরো কার্যক্রম তদারকিতে ভৌগোলিক তথ্যব্যবস্থাভিত্তিক (জিআইএস) প্রযুক্তি ও অনলাইন মনিটরিং ব্যবহার করা হবে।
মন্ত্রী বলেন, ফ্যামিলি কার্ডের জন্য কাউকে কোনো অফিসে যেতে হবে না। তথ্য সংগ্রহকারীরা সরাসরি প্রত্যেকের বাড়িতে যাবেন। কোনো অফিসে বসে বা একটি স্থানে একসঙ্গে কয়েকটি পরিবারের তথ্য সংগ্রহ করা যাবে না।
প্রতিদিন আট ঘণ্টা কাজের মধ্যে প্রত্যেক তথ্য সংগ্রহকারীকে ১০ থেকে ১৫টি পরিবারের তথ্য সংগ্রহের লক্ষ্য দেওয়া হয়েছে। তথ্যের নির্ভুলতা নিশ্চিত করতে স্থানীয় পর্যায় থেকে কেন্দ্রীয় পর্যায় পর্যন্ত তদারকির ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। ইউনিয়ন, উপজেলা, জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ের সরকারি কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে গঠিত কমিটি কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করবে। পাশাপাশি জাতীয় পর্যায়েও অগ্রগতি পর্যালোচনা করা হবে।
একাধিক সরকারি ভাতা পাওয়ার বিষয়টি যাচাই হবে
একই ব্যক্তি যাতে একাধিক সরকারি সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি থেকে একই ধরনের সুবিধা নিতে না পারেন, সে জন্য তথ্য যাচাইয়ের বিশেষ ব্যবস্থা রাখা হয়েছে বলে জানান মন্ত্রী।
প্রথমে পিএমটি স্কোরের মাধ্যমে যোগ্য পরিবার চিহ্নিত করা হবে। এরপর অর্থ মন্ত্রণালয়ের আইবাসসহ সংশ্লিষ্ট তথ্যব্যবস্থার মাধ্যমে যাচাই করা হবে, ওই ব্যক্তি আগে থেকেই অন্য কোনো সরকারি ভাতা বা সুবিধা পাচ্ছেন কি না। এ ক্ষেত্রে জাতীয় পরিচয়পত্রকে (এনআইডি) ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করা হবে।
মন্ত্রী আরও জানান, ফ্যামিলি কার্ড শুধু ভাতা বিতরণের মাধ্যম হবে না; এতে পরিবারের সদস্যদের তথ্যও যুক্ত থাকবে। ভবিষ্যতে এটি একটি সমন্বিত পারিবারিক তথ্যভান্ডার গড়ে তুলতে সহায়তা করবে।
আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে প্রায় ৪ কোটি ৪৫ লাখ পরিবারের তথ্য সংগ্রহ করে ডেটাবেইজে অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। প্রতি পরিবারে গড়ে পাঁচজন সদস্য ধরে এ হিসাব করা হয়েছে। তবে সংবাদ সম্মেলনে মন্ত্রী নভেম্বরের শেষ নাগাদ দেশব্যাপী তথ্য সংগ্রহ শেষ করার আশাও প্রকাশ করেন।
পাইলটিং কার্যক্রমের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে ধারণা করা হচ্ছে, পূর্ণাঙ্গ তথ্য সংগ্রহের পর প্রায় ১ কোটি ৬০ লাখ থেকে ২ কোটি ১৫ লাখ পরিবার ভাতার যোগ্য হতে পারে। তবে তথ্য সংগ্রহ ও যাচাই-বাছাই শেষ হওয়ার পরই যোগ্য পরিবারের চূড়ান্ত সংখ্যা জানা যাবে।
চলতি অর্থবছরে নতুন করে ৪০ লাখ নারী পরিবারপ্রধানকে ভাতা দেওয়ার পাশাপাশি পরবর্তী তিন অর্থবছরে পর্যায়ক্রমে সব যোগ্য নারী পরিবারপ্রধানকে কর্মসূচির আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে।
পাইলট প্রকল্পে ভাতা পেয়েছেন ৭১ হাজার ৮৩১ নারী
মন্ত্রী জানান, গত ১০ মার্চ প্রধানমন্ত্রী ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির পাইলটিং কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন। জুন পর্যন্ত দেশের আট বিভাগের ৪৪ জেলার ৫৫টি উপজেলা ও সিটি করপোরেশনের মোট ৫৭টি ইউনিটে এ কার্যক্রম পরিচালিত হয়।
পাইলটিং পর্যায়ে ১ লাখ ১২ হাজার ৯৪টি পরিবারের তথ্য সংগ্রহ করা হয়। পিএমটি স্কোরের ভিত্তিতে যাচাই-বাছাই শেষে ৭১ হাজার ৮৩১ জনকে যোগ্য উপকারভোগী হিসেবে চিহ্নিত করে তাঁদের ফ্যামিলি কার্ড ও ভাতা দেওয়া হয়েছে।
এ পর্যায়ে বরাদ্দ ছিল ৮৬ কোটি ৬০ লাখ টাকা। এর মধ্যে ব্যয় হয়েছে ৬৫ কোটি ৭৩ লাখ টাকা, যার ৫৭ কোটি ২০ লাখ টাকা সরাসরি ভাতা হিসেবে বিতরণ করা হয়েছে।
পাইলটিং চলাকালে কয়েকটি এলাকায় তথ্য সংগ্রহে ত্রুটি ধরা পড়ে। বিশেষ করে যশোরের একটি এলাকায় ভৌগোলিক সীমানা নির্ধারণের সমস্যায় একটি গ্রামের তথ্য বাদ পড়েছিল। পরে তা সংশোধন করা হয় বলে জানান মন্ত্রী।
এটিএম ও মোবাইল ব্যাংকিংয়ে তোলা যাবে ভাতা
ফ্যামিলি কার্ডে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের পরিকল্পনার কথাও জানান সমাজকল্যাণমন্ত্রী। তাঁর ভাষ্য, কার্ডে ডুয়েল চিপ, কিউআর কোড ও নিয়ার ফিল্ড কমিউনিকেশন (এনএফসি) প্রযুক্তি থাকবে। এটি সরকারের ‘টাকাপে’ পেমেন্ট ব্যবস্থার সাথে যুক্ত করা হবে।
এর মাধ্যমে উপকারভোগীরা ব্যাংকের এটিএম বুথ, বিপণিবিতানের পয়েন্ট অব সেলস (পিওএস) এবং মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসেসের (এমএফএস) মাধ্যমে ভাতা উত্তোলন করতে পারবেন।
কার্ডে পরিবারের একাধিক সদস্যের তথ্য সংরক্ষিত থাকবে। এ কারণে ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তায় বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। অনুমোদন ছাড়া কেউ যাতে এসব তথ্য ব্যবহার করতে না পারে, সে জন্য প্রযুক্তিগত সুরক্ষাব্যবস্থা রাখা হবে বলে জানান মন্ত্রী।
দুই মাস অন্তর হালনাগাদ হবে তথ্য
ফ্যামিলি কার্ডের তথ্যভান্ডারকে স্থায়ী বা অপরিবর্তনীয় রাখা হবে না। সময়ের সাথে পরিবারের আর্থিক অবস্থা ও সদস্যসংখ্যা বদলাতে পারে। এসব পরিবর্তন বিবেচনায় তথ্যভান্ডারকে ‘ডায়নামিক সোশ্যাল রেজিস্ট্রি’ হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে।
এ ব্যবস্থায় স্থানীয় সমাজকর্মী ও সমাজকল্যাণ কর্মকর্তাদের মাধ্যমে নিয়মিত তথ্য যাচাই করা হবে। পাশাপাশি দুই মাস অন্তর পরিবর্তিত তথ্য পর্যবেক্ষণের পরিকল্পনা রয়েছে।
ভাতার অর্থ ব্যবহারের প্রভাবও মূল্যায়ন করবে সরকার। বিশেষ করে শিশুদের শিক্ষা ও স্বাস্থ্য, হাঁস-মুরগি পালন, সবজি চাষ, কুটিরশিল্প এবং পরিবারভিত্তিক আয়বর্ধক কর্মকাণ্ডে এই অর্থ কী ভূমিকা রাখছে, তা পর্যালোচনা করা হবে।
মন্ত্রী বলেন, সরকার চায় ভাতার অর্থ যেন শুধু দৈনন্দিন খরচে সীমাবদ্ধ না থাকে। নারীরা যাতে পরিবারের শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও আয়বর্ধক কর্মকাণ্ডের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন এবং নিজেদের অর্থনৈতিক সক্ষমতা বাড়াতে পারেন, সেটিও এ কর্মসূচির লক্ষ্য।
কর্মসূচির কার্যকারিতা মূল্যায়নে দেশি-বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয় ও উন্নয়ন সহযোগীরা আগ্রহ দেখিয়েছেন বলেও জানান তিনি। পাইলটিং পর্যায়ের উপকারভোগীদের ওপর ভাতার প্রভাব যাচাইয়ের উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে।
সরকারের লক্ষ্য, ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিকে আরও সমন্বিত, প্রযুক্তিনির্ভর ও স্বচ্ছ করা এবং পর্যায়ক্রমে দেশের সব যোগ্য নারী পরিবারপ্রধানের কাছে আর্থিক সহায়তা পৌঁছে দেওয়া।
সংবাদ সম্মেলনে সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমীন ও তথ্য অধিদপ্তরের প্রধান তথ্য কর্মকর্তা সৈয়দ আবদাল আহমেদসহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।









মন্তব্য
এখনো কেউ মন্তব্য করেননি। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।