বংশগত এমন একটি রোগের ঝুঁকি, যা কেড়ে নিতে পারে জীবনের স্বাভাবিক ছন্দ, এমনকি অকালে কেড়ে নিতে পারে প্রাণও। সেই রোগের আশঙ্কা থেকেই জেনেটিক পরীক্ষা করানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন যুক্তরাজ্যের তরুণী লরা সাইডস। পরীক্ষার ফলাফলে জানতে পারেন, বাবার কাছ থেকে অল্প বয়সে শুরু হওয়া আলঝেইমার রোগের ঝুঁকিপূর্ণ জিন উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছেন তিনিও। এই ফলাফল তাঁর জীবনের ভাবনা, পরিকল্পনা ও ভবিষ্যৎ দেখার দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দেয়।
লরার বাবা পেশায় একজন চিকিৎসক ছিলেন। চল্লিশের কোঠায় থাকতেই তাঁর শরীরে অল্প বয়সে শুরু হওয়া আলঝেইমার রোগের লক্ষণ দেখা দেয়। বাবার অসুস্থতার কারণে তাঁর দেখাশোনার দায়িত্ব নিতে গিয়ে লরাকে বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনাও ছেড়ে দিতে হয়েছিল। দীর্ঘদিন রোগের সঙ্গে লড়াই করার পর ২০০৯ সালে তাঁর বাবা মারা যান। বাবার মৃত্যুর পর লরা অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্নে চলে যান।
২০১৩ সালে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সঙ্গে পরামর্শ করতে গিয়ে লরা জানতে পারেন, জেনেটিক পরীক্ষার মাধ্যমে প্রায় ৯৯ দশমিক ৯৯৯ শতাংশ নির্ভুলতায় শনাক্ত করা সম্ভব যে তিনি ওই রোগের সঙ্গে সম্পর্কিত ঝুঁকিপূর্ণ জিন বহন করছেন কি না। চিকিৎসকদের ধারণা ছিল, তাঁর শরীরে জিনটি থাকলে ৪৬ থেকে ৪৮ বছর বয়সের মধ্যে আলঝেইমার রোগের লক্ষণ প্রকাশ পেতে পারে।
তবে পরীক্ষার ফলাফল জানার মানসিক চাপের কথা ভেবে শুরুতে জেনেটিক পরীক্ষা করাতে রাজি হননি লরা। কিন্তু বয়স ত্রিশের কোঠায় পৌঁছানোর পর বিষয়টি নিয়ে তাঁর মনে বারবার প্রশ্ন তৈরি হতে থাকে। শেষ পর্যন্ত দীর্ঘ ছয় মাসের জেনেটিক কাউন্সেলিংয়ের মধ্য দিয়ে নিজেকে মানসিকভাবে প্রস্তুত করে পরীক্ষার সিদ্ধান্ত নেন তিনি।
পরীক্ষার নমুনা দেওয়ার পর ফলাফলের জন্য তাঁকে অপেক্ষা করতে হয় ছয় সপ্তাহ। নির্ধারিত দিনে চিকিৎসকের কাছ থেকে ফলাফল জানতে গিয়ে তিনি জানতে পারেন, বাবার কাছ থেকেই আলঝেইমার রোগের ঝুঁকিপূর্ণ জিনটি পেয়েছেন। খবরটি শোনার পর প্রথমে বাক্রুদ্ধ হয়ে পড়েন লরা। পরবর্তী সময়ে তাঁকে গভীর হতাশা ও ক্ষোভ গ্রাস করে। নিজের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে এমন একটি কঠিন সত্য জানার পর কীভাবে স্বাভাবিক জীবনযাপন করবেন, তা বুঝে উঠতে পারছিলেন না তিনি।
বর্তমানে লরার বয়স ৪৩ বছর। চিকিৎসকদের আগের পূর্বাভাস অনুযায়ী, সম্ভাব্য উপসর্গ দেখা দেওয়ার বয়সসীমার কাছাকাছি পৌঁছে গেছেন তিনি। তবে বিষয়টি নিয়ে প্রতিনিয়ত আতঙ্কিত হয়ে জীবন কাটাতে চান না লরা। বরং চিকিৎসাবিষয়ক বিভিন্ন গবেষণায় অংশ নিয়ে রোগটি সম্পর্কে নতুন তথ্য উদ্ঘাটন এবং এর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে অবদান রাখার চেষ্টা করছেন।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি রেডিও ফোরের ‘লাইফ চেঞ্জিং’ পডকাস্টে নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন লরা। সেখানে তিনি জানান, জেনেটিক পরীক্ষার ফলাফল জানার পর জীবনের প্রতি তাঁর দৃষ্টিভঙ্গিতে বড় পরিবর্তন এসেছে। আগে ভবিষ্যতে বড় কোনো লক্ষ্য অর্জনের বিষয়টি বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে হলেও এখন তাঁর কাছে প্রিয়জনদের সঙ্গে সময় কাটানো, প্রকৃতির সান্নিধ্যে থাকা এবং দৈনন্দিন জীবনের ছোট ছোট আনন্দ উপভোগ করাই বেশি মূল্যবান।
লরার জীবনে মা হওয়ার স্বপ্নও ছিল। কিন্তু বংশগত রোগের ঝুঁকি এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মধ্যে সেটি ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা বিবেচনা করে শেষ পর্যন্ত মা হওয়ার পরিকল্পনা থেকে সরে আসেন তিনি। তবে এই সিদ্ধান্তের কারণে ভালোবাসা, সম্পর্ক কিংবা জীবনের আনন্দ থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে রাখতে চান না লরা।
একটি জেনেটিক পরীক্ষার ফলাফল লরাকে তাঁর ভবিষ্যৎ সম্পর্কে কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি করেছে। তবু অনিশ্চিত ভবিষ্যতের ভয়ে বর্তমানকে হারিয়ে ফেলতে চান না তিনি। বরং যতটা সম্ভব অর্থবহভাবে জীবন কাটানো এবং আলঝেইমার নিয়ে গবেষণায় অবদান রাখাকেই এখন জীবনের অন্যতম লক্ষ্য হিসেবে দেখছেন এই তরুণী।









মন্তব্য
এখনো কেউ মন্তব্য করেননি। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।