মূল লেখায় যান
শুক্রবার, ৬ নভেম্বর ২০২৬ · ২১ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
শিরোনাম
সারাবিশ্ব

অভিশংসনের উদ্যোগ নিলে ডেমোক্র্যাটরাই ধ্বংস হবে, হুঁশিয়ারি ট্রাম্পের

মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকান পার্টির বড় ধরনের পরাজয়ের পর নতুন করে অভিশংসনের মুখে পড়ার সম্ভাবনা তৈরি হলেও তা নিয়ে মোটেও উদ্বিগ্ন নন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। বরং তাঁকে ক্ষমতাচ্যুত করতে ডেমোক্র্যাটিক পার্টি তৃতীয়বারের মতো অভিশংসন প্রক্রিয়া শুরু করলে শেষ পর্যন্ত দলটিকেই চরম মূল্য দিতে হবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তিনি।...

অভিশংসনের উদ্যোগ নিলে ডেমোক্র্যাটরাই ধ্বংস হবে, হুঁশিয়ারি ট্রাম্পের

মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকান পার্টির বড় ধরনের পরাজয়ের পর নতুন করে অভিশংসনের মুখে পড়ার সম্ভাবনা তৈরি হলেও তা নিয়ে মোটেও উদ্বিগ্ন নন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। বরং তাঁকে ক্ষমতাচ্যুত করতে ডেমোক্র্যাটিক পার্টি তৃতীয়বারের মতো অভিশংসন প্রক্রিয়া শুরু করলে শেষ পর্যন্ত দলটিকেই চরম মূল্য দিতে হবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তিনি। ট্রাম্পের দাবি, তাঁর বিরুদ্ধে অভিশংসনের উদ্যোগ নেওয়া হলে তা ডেমোক্র্যাটদের রাজনৈতিকভাবে ধ্বংস করে দেবে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র বর্তমানে দেশটির ইতিহাসের সবচেয়ে সফল সময় পার করছে বলেও মন্তব্য করেছেন তিনি।

সম্প্রতি অনুষ্ঠিত মধ্যবর্তী নির্বাচনে মার্কিন কংগ্রেসের উভয় কক্ষ-প্রতিনিধি পরিষদ (হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভস) ও সিনেটের নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টি। এই নির্বাচনী বিপর্যয়ের ফলে ট্রাম্প প্রশাসনের মেয়াদের শেষ পর্যায় রাজনৈতিকভাবে আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ ডেমোক্র্যাটদের হাতে যাওয়ায় এখন ট্রাম্প প্রশাসনের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত, প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সাম্প্রতিক রদবদল এবং তাঁর ব্যবসায়িক লেনদেনসহ নানা বিষয়ে তদন্তের সুযোগ তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে অভিশংসন প্রক্রিয়া শুরু করার সম্ভাবনাও নতুন করে আলোচনায় এসেছে।

মার্কিন ইতিহাসে এখন পর্যন্ত কোনো প্রেসিডেন্টকে দুবারের বেশি অভিশংসিত করা হয়নি। তবে ট্রাম্পের ক্ষেত্রে তৃতীয়বারের মতো এমন উদ্যোগ নেওয়া হতে পারে বলে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা চলছে। এ বিষয়ে এক সাক্ষাৎকারে জানতে চাওয়া হলে ট্রাম্প বলেন, অভিশংসন নিয়ে তাঁর বিন্দুমাত্র উদ্বেগ নেই। তিনি বলেন, ‘আমি একেবারেই চিন্তিত নই। আমার বিশ্বাস, তারা যদি এমন পদক্ষেপ নেয়, তাহলে ডেমোক্র্যাটিক পার্টিই ধ্বংস হয়ে যাবে। একটি সফল দেশ পরিচালনার জন্য কেন অভিশংসন করা হবে? আমাদের দেশ এখন তার ইতিহাসের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি সফল।’

নির্বাচনের ফলাফল অনুযায়ী, ডেমোক্র্যাটরা সিনেটে অতিরিক্ত সাতটি আসন পেয়ে মোট ৫৪টি আসন নিশ্চিত করেছে, যা সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য প্রয়োজনীয় ৫১টি আসনের চেয়ে বেশি। তবে আলাস্কা ও মিসিসিপির ফল তখনো প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ থাকায় আনুষ্ঠানিক ঘোষণা বাকি ছিল। অন্যদিকে প্রতিনিধি পরিষদে ২৫টি অতিরিক্ত আসন পেয়ে ডেমোক্র্যাটদের আসনসংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৪০-এ। সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের জন্য প্রয়োজন ২১৮টি আসন। এদিকে নির্বাচনে রিপাবলিকানদের পরাজয়ের পর ট্রাম্পের অভিশংসনের সম্ভাবনা নিয়েও বিভিন্ন পূর্বাভাস সামনে এসেছে। প্রেডিকশন মার্কেট কালশির হিসাব অনুযায়ী, ট্রাম্পের অভিশংসিত হওয়ার সম্ভাবনা ৬ দশমিক ৬ শতাংশ বেড়ে ৭৬ দশমিক ৬ শতাংশে পৌঁছেছে।

রিপাবলিকান পার্টির জ্যেষ্ঠ নেতারাও ডেমোক্র্যাটদের সম্ভাব্য অভিশংসন উদ্যোগ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। লুইজিয়ানার প্রতিনিধি ও প্রতিনিধি পরিষদের প্রভাবশালী নেতা স্টিভ স্ক্যালিস এবং টেক্সাসের সিনেটর টেড ক্রুজ জানিয়েছেন, নতুন সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার পর ডেমোক্র্যাটরা ট্রাম্পকে তৃতীয়বারের মতো অভিশংসিত করার চেষ্টা করতে পারে। অন্যদিকে প্রতিনিধি পরিষদের স্পিকার হিসেবে দায়িত্ব নিতে যাওয়া হাকিম জেফরিস জানিয়েছেন, ট্রাম্পের বিরুদ্ধে অভিশংসন প্রক্রিয়া শুরু করা হবে কি না, সে বিষয়ে তাঁদের দলের সামনে সব বিকল্পই খোলা রয়েছে। তবে এ বিষয়ে এখনই চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি।

অভিশংসনের পাশাপাশি ট্রাম্প প্রশাসনের প্রতিরক্ষাবিষয়ক নীতিও ডেমোক্র্যাটদের সমালোচনার মুখে পড়েছে। প্রতিনিধি পরিষদের স্পিকার হাকিম জেফরিস জানিয়েছেন, তাঁদের অন্যতম অগ্রাধিকার হবে প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথকে তাঁর পদ থেকে সরানো। অন্যদিকে ইরান যুদ্ধ পরিচালনা নিয়ে নানা প্রশ্ন ও প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ চাপের মধ্যে হেগসেথকে সরিয়ে ফ্লোরিডার গভর্নর রন ডিস্যান্টিসকে প্রতিরক্ষামন্ত্রীর দায়িত্ব দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করছেন ট্রাম্প বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এ বিষয়ে প্রশাসনের কর্মকর্তা ও ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের কাছ থেকেও মতামত নিচ্ছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট।

ডেমোক্র্যাটিক পার্টির জ্যেষ্ঠ প্রতিনিধি জেমি রাসকিন অবশ্য মনে করেন, অভিশংসনই ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার একমাত্র পথ নয়। তাঁর মতে, প্রশাসনের কর্মকাণ্ডের ওপর নজরদারি এবং বিভিন্ন অনিয়মের বিষয়ে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে ডেমোক্র্যাটদের হাতে আরও বেশ কিছু কার্যকর সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক উপায় রয়েছে।

মার্কিন সংবিধান অনুযায়ী, প্রেসিডেন্ট বা কোনো সরকারি কর্মকর্তা রাষ্ট্রদ্রোহ, ঘুষ কিংবা অন্যান্য গুরুতর অপরাধ ও অসদাচরণে জড়িত হলে কংগ্রেসের মাধ্যমে তাঁর বিরুদ্ধে অভিশংসন প্রক্রিয়া শুরু করা যেতে পারে। ট্রাম্প প্রথমবার অভিশংসিত হন ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে। সে সময় প্রতিনিধি পরিষদের তৎকালীন স্পিকার ন্যান্সি পেলোসির নেতৃত্বে তাঁর বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার এবং কংগ্রেসের কাজে বাধা সৃষ্টির অভিযোগ আনা হয়। অভিযোগ ছিল, ২০২০ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে নিজের সম্ভাব্য প্রতিদ্বন্দ্বীকে রাজনৈতিকভাবে চাপে ফেলতে ইউক্রেনকে দেওয়া প্রায় ৪০ কোটি ডলারের সামরিক সহায়তা আটকে রেখেছিলেন ট্রাম্প। তবে ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে সিনেটে অনুষ্ঠিত বিচারে তিনি উভয় অভিযোগ থেকেই খালাস পান।

এরপর ২০২১ সালের ৬ জানুয়ারি ক্যাপিটল হিলে হামলার ঘটনায় উসকানি দেওয়ার অভিযোগে একই বছরের জানুয়ারিতে দ্বিতীয়বারের মতো অভিশংসিত হন ট্রাম্প। তবে ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে সিনেটের বিচারে আবারও খালাস পান তিনি। উল্লেখ্য, যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে এখন পর্যন্ত কোনো প্রেসিডেন্টকে অভিশংসনের পর সিনেটে প্রয়োজনীয় দুই-তৃতীয়াংশ ভোটের সমর্থন নিয়ে চূড়ান্তভাবে পদ থেকে অপসারণ করা সম্ভব হয়নি।

এদিকে মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের পরাজয়ের পেছনে ইরান যুদ্ধের ভূমিকা নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের ভেতরেই মতবিরোধ দেখা দিয়েছে। এ বিষয়ে প্রেসিডেন্টের সঙ্গে প্রকাশ্য বিরোধে জড়িয়েছেন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। তিনি মনে করেন, ইরান যুদ্ধের কারণে কংগ্রেসের উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ হারানো রাজনৈতিকভাবে বড় ধরনের ক্ষতি। ভ্যান্সের ভাষায়, নির্বাচনে রিপাবলিকানদের পরাজয়ের প্রধান কারণ ছিল এই যুদ্ধ। এমনকি প্রেসিডেন্ট নিজেও নির্বাচনের পর এ বাস্তবতা স্বীকার করেছেন বলে দাবি করেন তিনি।

ভ্যান্স আরও বলেন, ‘আগামী ছয় বছরের জন্য সিনেটের নিয়ন্ত্রণ হারানোর বিষয়টি এই যুদ্ধের তুলনায় কিছুই নয়-এমন দাবি কেউ করলে তাঁকে যুক্তি দিয়ে তা প্রমাণ করতে হবে। আমরা একমত হই বা না হই, অন্তত সত্যিটা স্বীকার করা উচিত।’ তাঁর এই বক্তব্যকে ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনকে সামনে রেখে নিজের রাজনৈতিক অবস্থান স্পষ্ট করার প্রচেষ্টা হিসেবেও দেখা হচ্ছে।

তবে ভাইস প্রেসিডেন্টের এমন সমালোচনা সরাসরি নাকচ করে দিয়েছেন ট্রাম্প। হোয়াইট হাউসের নতুন বলরুমের নির্মাণকাজ পরিদর্শনের সময় ভ্যান্সের মন্তব্য সম্পর্কে জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, ইরান যুদ্ধ নিয়ে তাঁর সিদ্ধান্ত ছিল সম্পূর্ণ সঠিক এবং এর জন্য যে মূল্য দিতে হয়েছে, তা যথার্থ। ফলে নির্বাচনী পরাজয়, সম্ভাব্য অভিশংসন এবং ইরান যুদ্ধ নিয়ে প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ মতবিরোধ-সব মিলিয়ে ট্রাম্পের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নতুন করে আলোচনায় এসেছে।

মন্তব্য

এখনো কেউ মন্তব্য করেননি। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।

আপনার মতামত লিখুন

০/২০০০