কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দারিদ্র্য বিমোচন, সামাজিক সুরক্ষা জোরদার এবং উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর মাধ্যমে দেশের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করাই সরকারের অর্থনৈতিক সংস্কার কর্মসূচির মূল লক্ষ্য বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর।
তিনি বলেন, উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া ভঙ্গুর অর্থনীতি, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বেকারত্ব এবং মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে সৃষ্ট জ্বালানি সংকটসহ নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে দেশকে এগিয়ে নিতে সরকার কাজ করছে। অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগ বৃদ্ধিকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
সোমবার রাজধানীতে বাংলাদেশ তৈরি পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) ‘ইএসজি প্ল্যাটফর্ম’ উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ড. এম মাসরুর রিয়াজ এবং বাংলাদেশে নিযুক্ত ডেনমার্কের রাষ্ট্রদূত ক্রিশ্চিয়ান ব্রিক্স মোলার।
অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলা ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট তুলে ধরে ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, বাংলাদেশের ইতিহাসে বিভিন্ন সময়ে বড় ধরনের অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলা করে নতুন আয়ের উৎস ও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা হয়েছে। ১৯৭৫ সালের পর যুদ্ধবিধ্বস্ত অর্থনীতি, দুর্ভিক্ষ, উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও জ্বালানি সংকটের মতো প্রতিকূল পরিস্থিতিতে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নতুন আয়ের উৎস সৃষ্টি এবং কর্মসংস্থান বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছিলেন। পরবর্তী সময়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার শাসনামলে নারীদের আনুষ্ঠানিক শ্রমবাজারে অংশগ্রহণ বৃদ্ধির মাধ্যমে দারিদ্র্য বিমোচনে অগ্রগতি অর্জিত হয় বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
বর্তমান পরিস্থিতিতে তরুণ ও শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থান নিশ্চিত করাকে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করেন অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা। তিনি বলেন, দেশের বিপুলসংখ্যক তরুণের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা জরুরি। একই সঙ্গে শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও কর্মসংস্থানের বাইরে থাকা জনগোষ্ঠীর মধ্যে নারীর উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি উদ্বেগের বিষয়। তাই নারী ও তরুণদের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ বাড়ানো এবং তাদের দক্ষতা অনুযায়ী কাজের সুযোগ সৃষ্টি করা প্রয়োজন।
সরকারের সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি সম্পর্কে তিনি বলেন, দায়িত্ব গ্রহণের পর সরকার কৃষিঋণ মওকুফ, ফ্যামিলি কার্ড চালু এবং শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় বাড়ানোর মতো উদ্যোগ নিয়েছে। এসব কর্মসূচির লক্ষ্য নিম্ন আয়ের মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়জনিত চাপ কমানো, দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে সহায়তা দেওয়া এবং সামাজিক সুরক্ষা কার্যক্রমকে আরও শক্তিশালী করা।
ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির সম্ভাব্য প্রভাব তুলে ধরে তিনি বলেন, স্বাধীন গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর মূল্যায়ন অনুযায়ী, টানা পাঁচ বছর এ কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা গেলে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে কমানো সম্ভব। একই সঙ্গে তিনি আগের সরকারের সময়ে কার্যকর উদ্যোগের ঘাটতির কারণে বিপুলসংখ্যক মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যাওয়ার বিষয়টিও তুলে ধরেন।
দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি প্রসঙ্গে তিতুমীর বলেন, বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন পূর্বাভাস দিয়েছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) পূর্বাভাস সাধারণত এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) তুলনায় কম এবং বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস মাঝামাঝি অবস্থানে থাকে। তবে অর্থনৈতিক সংস্কার কর্মসূচি কতটা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা যায়, তার ওপর ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধির গতি অনেকাংশে নির্ভর করবে।
স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে বাংলাদেশের উত্তরণ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, উত্তরণের প্রস্তুতির জন্য সময় বাড়ানোর প্রস্তাব নিয়ে সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আলোচনা এগিয়ে চলছে। অতীতে পর্যাপ্ত প্রস্তুতির ঘাটতি বিবেচনায় নিয়ে দেশীয় শিল্প ও অর্থনীতিকে আরও প্রস্তুত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে ডেনমার্ক, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং অন্যান্য উন্নয়ন সহযোগীর সমর্থনের জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন তিনি।
বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরিতে সরকারের পাঁচটি অগ্রাধিকার ক্ষেত্রের কথা তুলে ধরে অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা বলেন, নীতির ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা, ব্যবসা পরিচালনার পরিবেশ উন্নত করা, অর্থায়নের সুযোগ বাড়ানো, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং পণ্য পরিবহনে নিরবচ্ছিন্ন যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর সরকার গুরুত্ব দিচ্ছে। এসব ক্ষেত্রে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া গেলে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বাড়বে এবং শিল্প খাতের উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
করনীতির ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করার উদ্যোগ সম্পর্কে তিনি বলেন, ব্যবসায়ীদের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণের সুবিধার্থে পাঁচ বছরের করনীতির ধারাবাহিকতা বজায় রাখার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি বন্ধ হয়ে যাওয়া শিল্পকারখানা পুনরায় চালু করতে ৬০ হাজার কোটি টাকার একটি সহায়তা প্যাকেজ ঘোষণার কথা জানান তিনি। এ প্যাকেজের আওতায় মূল্যস্ফীতির হারের চেয়ে কম সুদে ঋণ দেওয়ার পরিকল্পনাও রয়েছে বলে উল্লেখ করেন উপদেষ্টা।
জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়ে তিনি বলেন, নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানো, নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধান, তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) ও তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) সরবরাহ বৃদ্ধি এবং ভাসমান সংরক্ষণ ও পুনর্গ্যাসীকরণ ইউনিট (এফএসআরইউ) স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এসব পদক্ষেপ বাস্তবায়িত হলে শিল্পকারখানায় জ্বালানি সরবরাহের সক্ষমতা বাড়বে এবং উৎপাদন কার্যক্রম সচল রাখতে সহায়তা করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
যোগাযোগ ও পরিবহন অবকাঠামোর উন্নয়ন প্রসঙ্গে তিতুমীর বলেন, পণ্য পরিবহনের গতি বাড়ানো, রেল যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন এবং ঢাকা-চট্টগ্রাম যোগাযোগ অবকাঠামো আরও কার্যকর করার জন্য বিভিন্ন উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এসব উদ্যোগ ২০২৯ সালের মধ্যে সম্পন্ন করার প্রত্যাশা রয়েছে। উন্নত যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে উঠলে পণ্য পরিবহনের সময় ও ব্যয় কমবে এবং দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য আরও গতিশীল হবে।
সবশেষে উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর গুরুত্ব তুলে ধরে অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা বলেন, নতুন বিনিয়োগের মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা গেলে করের হার না বাড়িয়েও অভ্যন্তরীণ সম্পদ আহরণ বাড়ানো সম্ভব। এতে সরকারের রাজস্ব আয় বৃদ্ধির পাশাপাশি শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে। একই সঙ্গে দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলা, শ্রমবাজারের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং সুস্থ ও কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী তৈরির মাধ্যমে দেশের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত করা সম্ভব হবে।









মন্তব্য
এখনো কেউ মন্তব্য করেননি। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।