মূল লেখায় যান
শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর ২০২৬ · ৭ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
শিরোনাম
জাতীয়

তারেক রহমানের উদ্যোগে উৎসবমুখর দুর্গোৎসব, নিরাপত্তায় জোর

সব শঙ্কা ও উদ্বেগ পেছনে ফেলে আনন্দ-উৎসাহের মধ্য দিয়ে শান্তিপূর্ণভাবে শেষ হয়েছে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজা। আনন্দ, উচ্ছ্বাস ও বিদায়ের আবেগঘন পরিবেশে বুধবার সন্ধ্যায় প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হয় পাঁচ দিনব্যাপী এই আয়োজন। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বিশ্বাস, বিজয়া দশমীর মূল তাৎপর্য হলো মানুষের মনের...

তারেক রহমানের উদ্যোগে উৎসবমুখর দুর্গোৎসব, নিরাপত্তায় জোর

সব শঙ্কা ও উদ্বেগ পেছনে ফেলে আনন্দ-উৎসাহের মধ্য দিয়ে শান্তিপূর্ণভাবে শেষ হয়েছে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজা। আনন্দ, উচ্ছ্বাস ও বিদায়ের আবেগঘন পরিবেশে বুধবার সন্ধ্যায় প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হয় পাঁচ দিনব্যাপী এই আয়োজন। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বিশ্বাস, বিজয়া দশমীর মূল তাৎপর্য হলো মানুষের মনের ক্রোধ, হিংসা, লোভ ও লালসার মতো নেতিবাচক প্রবৃত্তি বিসর্জন দিয়ে সত্য, ন্যায় ও কল্যাণের পথে এগিয়ে যাওয়া। পারস্পরিক সম্প্রীতি, ভ্রাতৃত্ব ও শান্তির বার্তা ছড়িয়ে দেওয়াই এ উৎসবের অন্যতম উদ্দেশ্য।

গত ১৬ অক্টোবর ষষ্ঠী তিথিতে চণ্ডীপাঠ, দেবীর বোধন ও অধিবাসের মধ্য দিয়ে শুরু হয় শারদীয় দুর্গোৎসব। পরবর্তী দিনগুলোতে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকার পূজামণ্ডপে ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান, পূজা-অর্চনা ও নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে উৎসব উদযাপন করেন ভক্তরা। দশমী তিথিতে প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হয় এবারের দুর্গোৎসব।

এবারের দুর্গাপূজায় নিরাপত্তা ও নির্বিঘ্নে উৎসব উদযাপনের বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পায়। সরকারের পক্ষ থেকে নেওয়া বিভিন্ন নিরাপত্তামূলক পদক্ষেপ, পূজামণ্ডপ পরিদর্শন এবং সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের উদ্যোগ উৎসবের পরিবেশে বাড়তি মাত্রা যোগ করে। পূজা উপলক্ষে পাঁচ দিনের ছুটি ঘোষণা এবং অনুদানের অর্থ বৃদ্ধির বিষয়টিও আলোচনায় আসে। তবে উৎসব চলাকালে বিচ্ছিন্ন কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেছে কি না, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পূর্ণাঙ্গ তথ্যের ভিত্তিতে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।

বাংলাদেশে গত কয়েক বছরে দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন স্থানে প্রতিমা ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ, চুরি ও অন্যান্য অপ্রীতিকর ঘটনার খবর পাওয়া গেছে। বিশেষ করে ২০২৪ সালে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল। এ কারণে এবারের পূজার আগে দেশের বিভিন্ন এলাকার সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা ছিল। পূজামণ্ডপে কোনো ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা যাতে না ঘটে, সে জন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতা ও নজরদারি বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।

নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দেশজুড়ে বিপুলসংখ্যক নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েন, যানবাহনে টহল, গোয়েন্দা নজরদারি এবং গুরুত্বপূর্ণ পূজামণ্ডপে বিশেষ তল্লাশির ব্যবস্থা নেওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি সম্ভাব্য অপ্রীতিকর পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিশেষ দল প্রস্তুত রাখা এবং অতিরিক্ত সদস্য রিজার্ভ রাখার ব্যবস্থাও ছিল বলে সংশ্লিষ্ট বিবরণে জানানো হয়েছে। এসব পদক্ষেপের লক্ষ্য ছিল পূজামণ্ডপ ও আশপাশের এলাকায় নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং ভক্তদের নির্বিঘ্নে ধর্মীয় আচার পালনের পরিবেশ তৈরি করা।

পূর্ববর্তী বছরগুলোর ঘটনাও এবারের দুর্গাপূজার নিরাপত্তা আলোচনায় গুরুত্ব পেয়েছে। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট থেকে ৯ অক্টোবর পর্যন্ত পূজামণ্ডপকে কেন্দ্র করে ৪৬টি ঘটনার কথা উল্লেখ করা হয়েছিল। এসব ঘটনায় ১৭টি মামলা ও ২১টি সাধারণ ডায়েরি করা হয়। ঘটনার ধরন হিসেবে প্রতিমা বা পূজামণ্ডপে ভাঙচুর, চুরি, অগ্নিসংযোগসহ অন্যান্য অভিযোগের কথা বলা হয়। এসব ঘটনায় ১৯ জনকে গ্রেপ্তারের তথ্যও উল্লেখ করা হয়েছিল। তবে ঘটনাগুলোর সুনির্দিষ্ট সংখ্যা, শ্রেণিবিন্যাস ও সময়সীমা সংশ্লিষ্ট সরকারি নথির সঙ্গে মিলিয়ে দেখা প্রয়োজন।

এমন পরিস্থিতিতে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে আস্থা তৈরি এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বার্তা পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগ হিসেবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বিভিন্ন জেলার পূজামণ্ডপ পরিদর্শনের বিষয়টি সামনে আসে। রংপুর, রাজশাহী ও চট্টগ্রামে তাঁর সফরকে ঘিরে পূজামণ্ডপগুলোতে বাড়তি আগ্রহ তৈরি হয়। এসব সফরে তিনি পূজারিদের সঙ্গে কুশল বিনিময় করেন এবং সনাতন ধর্মাবলম্বীদের শুভেচ্ছা জানান। তাঁর উপস্থিতিকে কেন্দ্র করে স্থানীয় ভক্ত ও দর্শনার্থীদের মধ্যে উৎসবের আমেজ আরও বাড়ে বলে সংশ্লিষ্ট বিবরণে উল্লেখ করা হয়েছে।

পূজার শেষ পর্যায়ে দেশের উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন জেলার পূজামণ্ডপ পরিদর্শন করেন প্রধানমন্ত্রী। রংপুরের রাধাগোবিন্দ ধর্মসভা মন্দিরে গিয়ে তিনি উপস্থিত ভক্তদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন। এ সময় দর্শনার্থীদের সঙ্গে তাঁর সৌজন্য বিনিময় ও সেলফি তোলার ঘটনাও আলোচনায় আসে। পরে তিনি রাজশাহীর ধর্মসভা মন্দিরের দুর্গাপূজামণ্ডপ পরিদর্শন করেন। সেখানে পূজারিদের সঙ্গে কথা বলেন এবং সনাতন ধর্মাবলম্বীদের শুভেচ্ছা জানান।

এরপর মঙ্গলবার রাত ৮টা ২০ মিনিটে চট্টগ্রামের জে এম সেন হলে পৌঁছান প্রধানমন্ত্রী। বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ, চট্টগ্রাম মহানগর শাখার উদ্যোগে দীর্ঘদিন ধরে সেখানে দুর্গাপূজার আয়োজন হয়ে আসছে। আয়োজকদের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রীর এই সফর ছিল তাঁদের জন্য বিশেষ উপলক্ষ। তাঁকে স্বাগত জানাতে সড়কের দুই পাশে ভক্ত ও সাধারণ মানুষ উপস্থিত হন এবং উলুধ্বনির মাধ্যমে শুভেচ্ছা জানান।

পূজামণ্ডপ পরিদর্শনের পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ, গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলন এবং ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে বিভিন্ন ধর্ম, মত ও শ্রেণি-পেশার মানুষের অংশগ্রহণের কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে মানুষ ধর্মীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে দেশ স্বাধীন করার জন্য লড়াই করেছিল। একইভাবে গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনেও বিভিন্ন ধর্ম ও শ্রেণি-পেশার মানুষ একসঙ্গে অংশ নিয়েছে।

২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, ওই আন্দোলনেও দল, মত, ধর্ম ও বর্ণনির্বিশেষে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের অংশগ্রহণ ছিল। তাঁর বক্তব্যে দেশের সব সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহাবস্থান ও ঐক্য বজায় রাখার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।

প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, বাংলাদেশে বিভিন্ন ধর্মের মানুষ দীর্ঘদিন ধরে পাশাপাশি বসবাস করে আসছে। ভবিষ্যতেও যেন সবাই নিরাপদে ও শান্তিপূর্ণভাবে বসবাস করতে পারে, সে পরিবেশ বজায় রাখা প্রয়োজন। প্রত্যাশিত বাংলাদেশ গড়ে তুলতে সব ধর্ম ও মতের মানুষকে একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি। একই সঙ্গে শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, কর্মসংস্থান এবং দেশের শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখার বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দেন।

তারেক রহমানের পূজামণ্ডপ পরিদর্শন ও সম্প্রীতির বার্তাকে কেন্দ্র করে এবারের দুর্গোৎসবে সরকারের ভূমিকা নিয়ে আলোচনা তৈরি হয়েছে। ধর্মীয় উৎসব নির্বিঘ্নে উদযাপনের জন্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মধ্যে আস্থা বাড়ানো এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখা যেকোনো সরকারের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। উৎসবের সময় নিরাপত্তা ব্যবস্থার কার্যকারিতা মূল্যায়নের পাশাপাশি ভবিষ্যতেও সব ধর্মের মানুষের সমান অধিকার, নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত করার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

সব মিলিয়ে, এবারের দুর্গাপূজাকে ঘিরে নিরাপত্তা, সরকারি উদ্যোগ এবং প্রধানমন্ত্রীর বিভিন্ন পূজামণ্ডপ পরিদর্শন বিশেষভাবে আলোচিত হয়েছে। তবে উৎসবের প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করে শুধু কয়েক দিনের নিরাপত্তা আয়োজনের ওপর নয়; বরং সারা বছর সব সম্প্রদায়ের মানুষের ধর্মীয় স্বাধীনতা, নিরাপত্তা, সমান অধিকার এবং পারস্পরিক আস্থা বজায় রাখার ওপর। একটি শান্তিপূর্ণ, বৈষম্যহীন ও সম্প্রীতিপূর্ণ বাংলাদেশ গড়ে তুলতে রাষ্ট্র, রাজনৈতিক দল, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং সাধারণ মানুষের সম্মিলিত ভূমিকা অপরিহার্য।

মন্তব্য

এখনো কেউ মন্তব্য করেননি। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।

আপনার মতামত লিখুন

০/২০০০