মূল লেখায় যান
শনিবার, ২৪ অক্টোবর ২০২৬ · ৮ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
শিরোনাম
সারাবিশ্ব

ট্রাম্পের নতুন যুদ্ধের হুঁশিয়ারি, ইরানে ফের হামলার প্রস্তুতি যুক্তরাষ্ট্রের

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনার মধ্যে ইরানে আবারও সামরিক অভিযান চালানোর ইঙ্গিত দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। একই সঙ্গে ইরানে নতুন করে হামলা চালানোর সম্ভাবনাকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক তৎপরতা বাড়ার খবর পাওয়া যাচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে উপসাগরীয় অঞ্চলে নতুন করে বড় ধরনের সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।...

ট্রাম্পের নতুন যুদ্ধের হুঁশিয়ারি, ইরানে ফের হামলার প্রস্তুতি যুক্তরাষ্ট্রের

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনার মধ্যে ইরানে আবারও সামরিক অভিযান চালানোর ইঙ্গিত দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। একই সঙ্গে ইরানে নতুন করে হামলা চালানোর সম্ভাবনাকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক তৎপরতা বাড়ার খবর পাওয়া যাচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে উপসাগরীয় অঞ্চলে নতুন করে বড় ধরনের সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। কূটনৈতিক আলোচনার পাশাপাশি সামরিক প্রস্তুতি জোরদার হওয়ায় ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে চলমান উত্তেজনা কোন দিকে মোড় নেয়, তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।

শনিবার (২৪ অক্টোবর) প্রকাশিত গালফ নিউজের এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায় এক সমাবেশে বক্তব্য দেওয়ার সময় ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, ‘আমরা হয়তো আবারও ছোটখাটো অপারেশন এপিক ফিউরি অভিযান চালাতে পারি।’ ইরানে মার্কিন সামরিক অভিযানের জন্য ব্যবহৃত নাম ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’। ট্রাম্পের এই বক্তব্যকে ইরানে নতুন করে সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার সম্ভাব্য ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে।

এর আগে ট্রাম্প দাবি করেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র চাইলে দ্রুত যুদ্ধের অবসান ঘটাতে পারে। তবে সংঘাত দ্রুত শেষ করার চেষ্টা করা উচিত, নাকি ধীরে ধীরে পরিস্থিতির সমাধান করা উচিত, সে বিষয়ে তিনি প্রশ্ন তোলেন। তাঁর সাম্প্রতিক বক্তব্যে একদিকে সামরিক পদক্ষেপের সম্ভাবনা, অন্যদিকে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের সুযোগ-দুই বিষয়ই সামনে এসেছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের পরবর্তী পদক্ষেপ নিয়ে অনিশ্চয়তা আরও বেড়েছে।

এদিকে, চলতি সপ্তাহান্তে একই ধরনের ইঙ্গিত দিয়েছেন তুরস্কে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত টম ব্যারাক। ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর রেডিওকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তাঁকে প্রশ্ন করা হয়, সপ্তাহান্তেই ইরানে হামলা হতে পারে কি না। জবাবে তিনি বলেন, এমনটা অবশ্যই হতে পারে। ব্যারাক আরও বলেন, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অবস্থান স্পষ্ট। তিনি একটি চুক্তিতে পৌঁছানোর বিষয়ে আগ্রহী ও প্রস্তুত এবং কয়েক মাস ধরেই আলোচনার টেবিলে রয়েছেন। তাঁর বক্তব্যে কূটনৈতিক সমাধানের সম্ভাবনার পাশাপাশি সামরিক পদক্ষেপের আশঙ্কাও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

অন্যদিকে, আগামী ৩ নভেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ও পরে ইরান পরিস্থিতি নিয়ে রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। একই সময়ে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু সাম্প্রতিক দিনগুলোতে বারবার ইরানের সরকারকে উৎখাতের অঙ্গীকার করেছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান এবং ইরানের পাল্টা প্রতিক্রিয়ার সম্ভাবনা-সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠছে।

বিশেষজ্ঞদের ধারণা, ইরানের বিরুদ্ধে নতুন করে বড় ধরনের সামরিক অভিযান চালানোর প্রস্তুতি নিতে পারে যুক্তরাষ্ট্র। তবে দীর্ঘস্থায়ী ও ধ্বংসাত্মক এই সংঘাতের সামরিক সমাধান পাওয়া কোনো পক্ষের জন্যই সহজ হবে না। তাঁদের মতে, হামলা ও পাল্টা হামলার মাধ্যমে সাময়িক সামরিক সুবিধা অর্জন করা সম্ভব হলেও তাতে মূল বিরোধের স্থায়ী সমাধান নিশ্চিত হওয়ার সম্ভাবনা কম।

বিশেষজ্ঞরা আরও বলছেন, ওয়াশিংটন ও তেহরানের বাহিনীগুলো এখন বাণিজ্যিক জাহাজকে লক্ষ্য করে নিয়মিত হামলা ও পাল্টা পদক্ষেপের একটি বিপজ্জনক ধারায় জড়িয়ে পড়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বন্দরগুলোতে অবরোধ কার্যকর করার চেষ্টা করছে। অন্যদিকে, ইরান কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালীর ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহ ও আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক বাণিজ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথ ঘিরে উত্তেজনা বাড়লে তার প্রভাব মধ্যপ্রাচ্যের বাইরেও ছড়িয়ে পড়তে পারে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সেপ্টেম্বরের শুরুর দিক থেকে কোনো পক্ষই স্থলভাগে বড় ধরনের হামলা চালায়নি। তবে এই আপাত বিরতি যে দীর্ঘস্থায়ী হবে, তার নিশ্চয়তা নেই। সামরিক প্রস্তুতি, নৌ-অবরোধ এবং পাল্টাপাল্টি হুমকির কারণে পরিস্থিতির যেকোনো সময় অবনতি ঘটতে পারে। বিশেষ করে কোনো ভুল হিসাব, আকস্মিক হামলা কিংবা আলোচনার অগ্রগতি থেমে গেলে সংঘাত আবারও তীব্র আকার ধারণ করতে পারে।

ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের ফরেন পলিসি প্রোগ্রামের পরিচালক সুজান ম্যালনি মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্রের ৩ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পরপরই ইরানে নতুন করে হামলা শুরু হতে পারে। তবে এটি তাঁর ব্যক্তিগত মূল্যায়ন; হামলার সময় সম্পর্কে নিশ্চিত কোনো ঘোষণা নয়। নিজের আশঙ্কার পক্ষে তিনি মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের অতিরিক্ত সামরিক সরঞ্জাম ও সেনা মোতায়েন, ওই অঞ্চলে অবস্থানরত মার্কিন নাগরিকদের সতর্কবার্তা এবং ইসরায়েলি বাহিনীর সর্বোচ্চ সতর্কাবস্থায় থাকার বিষয়গুলো তুলে ধরেন।

ম্যালনির মতে, বর্তমান পরিস্থিতি দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকা কোনো পক্ষের জন্যই টেকসই নয়। একদিকে মার্কিন অবরোধের কারণে ইরানের জনগণ চরম দুর্ভোগের মুখে পড়ছে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে, অন্যদিকে অবরোধ কার্যকর রাখতে যুক্তরাষ্ট্রকে বিপুল নৌ-সম্পদ ও সামরিক শক্তি নিয়োজিত রাখতে হচ্ছে। ফলে সংঘাতের অবসানে কূটনৈতিক সমঝোতা অথবা নতুন সামরিক পদক্ষেপের মতো কোনো একটি পথ বেছে নেওয়ার চাপ বাড়ছে। তবে সামরিক পদক্ষেপ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে বলেও আশঙ্কা রয়েছে।

আসন্ন হামলার সময় নির্ধারণ কঠিন

মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ গবেষক জেসন ক্যাম্পবেলের মতে, সাম্প্রতিক কিছু ঘটনা ইঙ্গিত দিচ্ছে যে ইরানে নতুন করে হামলার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। যুক্তরাষ্ট্র আশঙ্কা করছে, ইরান অথবা ইয়েমেনে তাদের মিত্র হুথি গোষ্ঠী মার্কিন স্বার্থ ও সামরিক স্থাপনাকে লক্ষ্য করে হামলা চালাতে পারে। এই আশঙ্কা মোকাবিলায় ওয়াশিংটন মধ্যপ্রাচ্যে নিজেদের সামরিক উপস্থিতি বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

ক্যাম্পবেল জানান, মধ্যপ্রাচ্যে ‘ইউএসএস থিওডোর রুজভেল্ট’ বিমানবাহী রণতরি মোতায়েনের পরিকল্পনার কথা সামনে এসেছে। এটি বাস্তবায়িত হলে ওই অঞ্চলে মার্কিন বিমানবাহী রণতরি বহরের সংখ্যা সাময়িকভাবে তিনটিতে পৌঁছাতে পারে। পাশাপাশি আরও একটি ‘মেরিন এক্সপেডিশনারি ইউনিট’ পাঠানোর সিদ্ধান্তের কথাও উল্লেখ করেন তিনি। এসব সামরিক প্রস্তুতি যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য অভিযান পরিচালনার সক্ষমতা বাড়াতে পারে। তবে সামরিক শক্তি বৃদ্ধি মানেই যে অবিলম্বে হামলা শুরু হবে, তা নিশ্চিতভাবে বলা যায় না।

এ ছাড়া ইসরায়েলি যুদ্ধবিমানগুলো সম্প্রতি ইরানে আগের হামলার আদলে শক্তি প্রদর্শন করেছে বলে ক্যাম্পবেল উল্লেখ করেন। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথের সঙ্গে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর বৈঠকও পরিস্থিতির গুরুত্ব বাড়িয়েছে। সামরিক তৎপরতা ও উচ্চপর্যায়ের বৈঠকগুলোকে সম্ভাব্য পরবর্তী পদক্ষেপের প্রেক্ষাপটে দেখা হলেও এগুলোর ভিত্তিতে হামলার নির্দিষ্ট সময় নির্ধারণ করা কঠিন।

কবে নতুন করে যুদ্ধ শুরু হতে পারে, সে বিষয়ে নিশ্চিত পূর্বাভাস দেওয়া সম্ভব নয় বলে মনে করেন ক্যাম্পবেল। তাঁর মতে, যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশ্য যদি কেবল ইরানকে আলোচনার টেবিলে ফিরিয়ে আনা হয়, তাহলে সামরিক প্রস্তুতির এই ব্যাপকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। অন্যদিকে, ওয়াশিংটন যদি সত্যিই বড় ধরনের অভিযান চালাতে চায়, তবে সামরিক সক্ষমতা, আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং সম্ভাব্য পাল্টা হামলার বিষয়গুলোও বিবেচনায় নিতে হবে।

ক্যাম্পবেলের মূল্যায়ন অনুযায়ী, সংঘাতের শুরুর তুলনায় ট্রাম্পের হাতে এখন সামরিক বিকল্পের পরিসর সংকুচিত হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ঘাঁটিগুলোর ক্ষয়ক্ষতি হয়ে থাকলে তা নতুন কোনো স্থল অভিযান পরিচালনাকে আরও কঠিন করে তুলতে পারে। এ ধরনের অভিযান চালাতে বিপুলসংখ্যক সেনা, নিরাপদ সামরিক ঘাঁটি, সরবরাহব্যবস্থা এবং দীর্ঘমেয়াদি রসদের প্রয়োজন হবে। কিন্তু এসব উপাদান নিশ্চিত করা বর্তমান পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।

তিনি আরও বলেন, এই মুহূর্তে এমন কোনো নিরাপদ জায়গা নেই, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র এ ধরনের অভিযানের জন্য প্রয়োজনীয় হাজার হাজার-এমনকি কোনো কোনো পরিস্থিতিতে দশ হাজারেরও বেশি-সেনা সহজে মোতায়েন করতে পারবে। অর্থাৎ, আকাশপথে হামলা চালানোর সক্ষমতা থাকলেও বড় আকারের স্থল অভিযান পরিচালনা করা সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি সামরিক চ্যালেঞ্জ।

ইরানে যুদ্ধের প্রথম ৫০ দিনে যে ধরনের হামলা চালানো হয়েছিল, একই ধরনের অভিযান আবারও পরিচালনা করা হলে দেশটির শাসনব্যবস্থার কৌশলগত অবস্থানে বড় ধরনের পরিবর্তন আসবে কি না, তা নিয়েও সংশয় প্রকাশ করেছেন ক্যাম্পবেল। তাঁর মতে, ইরান ইতোমধ্যে উল্লেখযোগ্য শারীরিক ক্ষয়ক্ষতি সহ্য করার সক্ষমতা দেখিয়েছে। এমনকি হামলার লক্ষ্যবস্তু পরিবর্তন করে গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো কিংবা বেসামরিক স্থাপনাকে অন্তর্ভুক্ত করা হলেও সংঘাতের সামগ্রিক ফলাফল প্রত্যাশিতভাবে বদলে যাবে-এমন নিশ্চয়তা নেই। বরং এতে বেসামরিক মানুষের দুর্ভোগ বাড়া এবং আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতা আরও গভীর হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।

সব মিলিয়ে, ট্রাম্পের সাম্প্রতিক বক্তব্য, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক প্রস্তুতি এবং ইসরায়েলের কঠোর অবস্থান ইরানকে ঘিরে নতুন করে যুদ্ধের আশঙ্কা বাড়িয়েছে। তবে হামলা আসন্ন কি না, কিংবা কূটনৈতিক আলোচনা শেষ পর্যন্ত কোনো সমঝোতায় পৌঁছাবে কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়। সামরিক শক্তি প্রদর্শন ও পাল্টাপাল্টি হুমকির মধ্যে আগামী দিনগুলোতে ওয়াশিংটন ও তেহরানের সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে মধ্যপ্রাচ্য নতুন সংঘাতের দিকে এগোবে, নাকি আলোচনার মাধ্যমে উত্তেজনা প্রশমনের সুযোগ তৈরি হবে।

মন্তব্য

এখনো কেউ মন্তব্য করেননি। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।

আপনার মতামত লিখুন

০/২০০০