বাজারে গিয়ে একটু সাশ্রয়ের আশা করেন ক্রেতারা। কিন্তু চাল, আলু, পেঁয়াজ, রসুন, আদা থেকে শুরু করে মাছ, মুরগি ও মাংস—প্রায় সব পণ্য কিনতেই গুনতে হচ্ছে বাড়তি টাকা। রাজধানীর পাইকারি বাজারের তুলনায় স্থানীয় খুচরা বাজারে এসব পণ্যের দাম বেশি হওয়ায় চাপে পড়ছেন সাধারণ ভোক্তারা। সীমিত আয়ে সংসারের খরচ সামলাতে গিয়ে বাড়তি এই ব্যয় তাদের দুশ্চিন্তা আরও বাড়াচ্ছে।
রাজধানীর পাইকারি ও স্থানীয় খুচরা বাজারে একই পণ্যের দামে উল্লেখযোগ্য ব্যবধান দেখা গেছে। কোনো কোনো পণ্যে কেজিতে ১০ থেকে ২০ টাকা বেশি দিতে হচ্ছে ক্রেতাদের। আবার রসুন, আদা, মাছ ও মাংসের মতো পণ্যে এই ব্যবধান আরও বেশি। বিশেষ করে খাসির মাংসের ক্ষেত্রে কেজিতে ১০০ টাকা পর্যন্ত বেশি খরচ করতে হচ্ছে ক্রেতাদের।
রাজধানীর কাওরান বাজারের পাইকারি বাজারের সাথে মুগদা, মানিকনগর, খিলগাঁও, বাসাবো ও কমলাপুর এলাকার স্থানীয় বাজারের পণ্যমূল্য তুলনা করে এমন চিত্র পাওয়া গেছে।
পাইকারি ও খুচরা দামে বড় ব্যবধান
বাজার ঘুরে দেখা যায়, চালের বিভিন্ন জাতের দাম পাইকারি বাজারের তুলনায় স্থানীয় বাজারে বেশি। কাওরান বাজারে মোটা চাল গুটি স্বর্ণার ২৫ কেজির বস্তা বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ১৫০ থেকে ১ হাজার ২০০ টাকায়। অর্থাৎ, প্রতি কেজির দাম ৪৬ থেকে ৪৮ টাকা। অথচ স্থানীয় বাজারে একই চাল বিক্রি হচ্ছে ৫২ থেকে ৫৫ টাকায়। এতে কেজিতে ৬ থেকে ৯ টাকা বেশি দিতে হচ্ছে ক্রেতাদের।
পাইজাম চালের ২৫ কেজির বস্তা পাইকারি বাজারে ১ হাজার ২০০ টাকা। সে হিসাবে কেজিপ্রতি দাম ৪৮ টাকা। স্থানীয় বাজারে এই চাল বিক্রি হচ্ছে ৫২ থেকে ৫৬ টাকায়। আটাশ চালের ২৫ কেজির বস্তা পাইকারি বাজারে ১ হাজার ৩৫০ টাকা হলেও স্থানীয় বাজারে কেজি বিক্রি হচ্ছে ৬০ থেকে ৬২ টাকায়। মিনিকেট চালের ক্ষেত্রেও একই চিত্র দেখা গেছে।
আলুর বাজারেও স্বস্তি নেই ক্রেতাদের। কাওরান বাজারে সাদা ও লাল আলুর কেজি ২০ টাকা হলেও স্থানীয় বাজারে তা বিক্রি হচ্ছে ৩০ টাকায়। অর্থাৎ, প্রতি কেজি আলু কিনতে ১০ টাকা বেশি খরচ হচ্ছে।
পেঁয়াজের ক্ষেত্রেও দামের ব্যবধান উল্লেখযোগ্য। পাইকারি বাজারে বাছাইকৃত বড় পেঁয়াজের কেজি ৪২ থেকে ৪৪ টাকা। স্থানীয় বাজারে একই পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ৫৫ থেকে ৬০ টাকায়। ফলে কেজিতে ১১ থেকে ১৮ টাকা পর্যন্ত বেশি দিতে হচ্ছে ক্রেতাদের।
আমদানিকৃত রসুন ও আদার দামেও রয়েছে বড় ব্যবধান। কাওরান বাজারে রসুনের কেজি ১৬৫ থেকে ১৭০ টাকা হলেও স্থানীয় বাজারে তা বিক্রি হচ্ছে ২০০ থেকে ২১০ টাকায়। অন্যদিকে, পাইকারি বাজারে আদার কেজি ১৭০ থেকে ১৮০ টাকা। স্থানীয় বাজারে এই আদা কিনতে খরচ হচ্ছে ২০০ থেকে ২২০ টাকা।
একাধিক নিত্যপণ্য কেনার সময় এই বাড়তি দাম সরাসরি প্রভাব ফেলছে পরিবারের মাসিক বাজারের বাজেটে। অল্প অল্প করে বাড়তি টাকা খরচ হলেও মাস শেষে তার পরিমাণ দাঁড়াচ্ছে উল্লেখযোগ্য অঙ্কে।
মাছ-মাংস কিনতেও বাড়তি টাকা
শুধু চাল ও সবজিজাতীয় পণ্য নয়, মাছের বাজারেও পাইকারি ও খুচরা দামের ব্যবধান ক্রেতাদের ভোগাচ্ছে। কাওরান বাজারে দুই কেজি ওজনের রুই ও কাতলা মাছ প্রতি কেজি ৩০০ থেকে ৩২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। স্থানীয় বাজারে একই আকারের মাছের দাম ৩৫০ থেকে ৩৬০ টাকা।
দেড় থেকে দুই কেজি ওজনের পাঙাশ পাইকারি বাজারে প্রতি কেজি ১৮০ থেকে ২০০ টাকা। স্থানীয় বাজারে একই মাছ বিক্রি হচ্ছে ২২০ থেকে ২৫০ টাকায়। আকারভেদে বড় পাঙাশের দামেও রয়েছে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য। পাইকারি বাজারে আড়াই থেকে তিন কেজি বা তার চেয়ে বড় পাঙাশের কেজি ২২০ থেকে ২৫০ টাকা হলেও স্থানীয় বাজারে দাম ২৮০ থেকে ৩০০ টাকা।
মুরগির বাজারেও বাড়তি খরচের চাপ রয়েছে। কাওরান বাজারে পোলট্রি মুরগির কেজি ১৭০ থেকে ১৮০ টাকা, যা স্থানীয় বাজারে বিক্রি হচ্ছে ১৯০ থেকে ২০০ টাকায়। সোনালি মুরগির কেজি পাইকারিতে ৩১০ থেকে ৩২০ টাকা হলেও স্থানীয় বাজারে তা ৩৪০ থেকে ৩৫০ টাকা। সাদা ও লাল লেয়ার মুরগির ক্ষেত্রেও পাইকারি বাজারের তুলনায় স্থানীয় বাজারে বেশি দাম দিতে হচ্ছে।
গরুর মাংসের কেজি কাওরান বাজারে ৭৮০ থেকে ৮০০ টাকা। স্থানীয় বাজারে একই মাংস বিক্রি হচ্ছে ৮২০ থেকে ৮৫০ টাকায়। খাসির মাংসের ক্ষেত্রে ব্যবধান আরও বেশি। পাইকারি বাজারে কেজি ১ হাজার ৩০০ টাকা হলেও স্থানীয় বাজারে তা ১ হাজার ৪০০ টাকা। অর্থাৎ, প্রতি কেজি খাসির মাংস কিনতে ১০০ টাকা বেশি খরচ হচ্ছে ক্রেতাদের। ছাগলের মাংসের ক্ষেত্রেও কেজিতে ৫০ টাকা ব্যবধান দেখা গেছে।
বাড়তি খরচের কারণ কী?
খুচরা ব্যবসায়ীরা বলছেন, দোকান পরিচালনার ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় পাইকারি ও খুচরা বাজারের দামে পার্থক্য তৈরি হচ্ছে। জ্বালানির দাম বাড়ায় পরিবহন খরচ বেড়েছে। পাশাপাশি বাণিজ্যিক বিদ্যুৎ বিল, কর্মীদের বেতন ও দোকানভাড়ার মতো ব্যয়ও বাড়ছে।
রাজধানীর মুগদা বাজারের ভাই-ভাই জেনারেল স্টোরের স্বত্বাধিকারী মোকলেছুদ্দিন মোল্লা বলেন, তার দোকানে তিনজন কর্মী রয়েছেন। প্রতিবছর তাদের বেতন বাড়াতে হয়। আগে প্রতি মাসে বিদ্যুৎ বিল আসত সাড়ে ৩ হাজার থেকে ৪ হাজার টাকা। এখন তা ৬ হাজার টাকা ছাড়িয়ে যায়। দোকানভাড়াসহ অন্যান্য খরচও বেড়েছে।
তার দাবি, এসব ব্যয় সামাল দিতে পাইকারি ও খুচরা বাজারের দামের ব্যবধান আরও বাড়ানো প্রয়োজন।
তবে বাড়তি খরচের কারণে দামের পার্থক্য তৈরি হলেও তা কমানোর উদ্যোগ নেওয়া দরকার বলে মনে করেন নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড ফাইন্যান্স বিভাগের অধ্যাপক এবং স্কুল অব বিজনেস অ্যান্ড ইকোনমিকসের ডিন এ কে এম ওয়ারেসুল করিম।
তিনি বলেন, দোকান পরিচালনার ক্ষেত্রে বাণিজ্যিক বিদ্যুৎ বিল, কর্মীদের বেতন, দোকানভাড়া ও অন্যান্য খরচ বিবেচনায় নিতে হয়। এসব ব্যয় পণ্যের বিক্রয়মূল্যে প্রভাব ফেলে। তবে পাইকারি ও খুচরা বাজারের দামের ব্যবধান কমানো উচিত। এ জন্য দোকান পরিচালনার ব্যয় কমাতে সরকারকে সহযোগিতা করতে হবে।
বাজার তদারকির দাবি
পাইকারি ও খুচরা বাজারের দামের এই ব্যবধান কমাতে সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তর, জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, স্থানীয় প্রশাসন এবং মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে নিয়মিত বাজার তদারকির প্রয়োজন বলে মনে করেন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি এ এইচ এম সফিকুজ্জামান।
তিনি বলেন, অত্যাবশ্যকীয় কিছু পণ্যের দাম সরকার নির্ধারণ করতে পারে। তবে অধিকাংশ পণ্যের দাম চাহিদা ও সরবরাহের ওপর নির্ভরশীল। তার অভিযোগ, বাজারে একটি গোপন সিন্ডিকেটের প্রভাব রয়েছে, যা পণ্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখছে।
সফিকুজ্জামান আরও বলেন, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইনে যৌক্তিক বিক্রয়মূল্য এবং ক্রয়-বিক্রয়ের রেকর্ড সংরক্ষণের বিধান রয়েছে। কিন্তু এসব নিয়ম যথাযথভাবে মানা হচ্ছে না বলে তিনি মনে করেন। এতে ভোক্তাদের কাছ থেকে অতিরিক্ত মুনাফা আদায়ের সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
তার মতে, কৃষি বিপণন আইনেও পণ্যের দামের ক্ষেত্রে ব্যবসায়ীদের মুনাফার সীমা নিয়ে বিধান রয়েছে। এসব আইন ও বিধিবিধানের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করা জরুরি।









মন্তব্য
এখনো কেউ মন্তব্য করেননি। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।