সাল ১৯৭৪। যুক্তরাষ্ট্রের একটি টেলিভিশন স্টুডিওতে সরাসরি সম্প্রচারিত হচ্ছিল সংবাদভিত্তিক অনুষ্ঠান। ক্যামেরার সামনে বসে আছেন ২৯ বছর বয়সী উপস্থাপিকা ক্রিস্টিন চাবাক। হঠাৎ গম্ভীর মুখে দর্শকদের উদ্দেশে বললেন, ‘এই অনুষ্ঠানে চাঞ্চল্যকর খবর দেখেন দর্শকরা। এবার তৈরি হবে নতুন নজির।’ এরপরই ঘটে যায় ভয়াবহ ঘটনা। লাইভ সম্প্রচারের মধ্যেই নিজের মাথায় গুলি করেন তিনি। মুহূর্তের মধ্যে গোটা আমেরিকায় ছড়িয়ে পড়ে চাঞ্চল্য।
ঘটনাটি ঘটেছিল ১৯৭৪ সালের ১৫ জুলাই, যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা অঙ্গরাজ্যের সারাসোটায় অবস্থিত WXLT-TV-এর স্টুডিওতে। চ্যানেলটির ‘Suncoast Digest’ অনুষ্ঠানের উপস্থাপনা করছিলেন ক্রিস্টিন। তাঁর এমন আকস্মিক সিদ্ধান্তে হতবাক হয়ে যান স্টুডিওর সহকর্মী থেকে শুরু করে টেলিভিশনের সামনে বসে থাকা দর্শকরা।
দ্রুত তাঁকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। চিকিৎসকদের আপ্রাণ চেষ্টা সত্ত্বেও শেষ পর্যন্ত বাঁচানো সম্ভব হয়নি তাঁকে। প্রায় ১৪ ঘণ্টা মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে হাসপাতালে শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন এই সাংবাদিক।
ক্রিস্টিন চাবাকের জন্ম ১৯৪৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ওহাইও অঙ্গরাজ্যে। সাংবাদিকতা ছিল তাঁর স্বপ্ন। ১৯৬৬ সালে কলেজের পড়াশোনা শেষ করে টেলিভিশন সাংবাদিকতা শুরু করেন তিনি।
প্রথম দিকে বিভিন্ন টেলিভিশন প্রতিষ্ঠানে কাজ করার পর ১৯৭৩ সালের শেষ দিকে WXLT-TV-তে যোগ দেন। শুরুতে রিপোর্টার হিসেবে কাজ করলেও পরবর্তী সময়ে উপস্থাপনার দায়িত্ব পান। ‘Suncoast Digest’ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে দর্শকদের কাছে পরিচিত হয়ে ওঠেন তিনি।
সহকর্মীদের কাছে ক্রিস্টিন ছিলেন প্রাণবন্ত ও হাসিখুশি একজন মানুষ। কিন্তু তাঁর ব্যক্তিগত জীবনে একাকিত্ব ও হতাশার অভিজ্ঞতা ছিল বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
বিশেষ করে সম্পর্ক ও বিয়ে নিয়ে তাঁর মধ্যে হতাশা কাজ করত বলে জানা যায়। কলেজজীবন থেকেই নিঃসঙ্গতার অনুভূতি তাঁকে তাড়া করত। ব্যক্তিগত জীবনের এই অভিজ্ঞতা নিয়ে তিনি এতটাই ভাবিত ছিলেন যে ‘ডেটলেস ওয়ান্ডার ক্লাব’ নামে একটি দলও গড়ে তুলেছিলেন। সেখানে তাঁর মতো সম্পর্কহীন ও একাকিত্বে ভোগা মানুষেরা একত্রিত হতেন।
ক্রিস্টিনের এমন আকস্মিক সিদ্ধান্তে তাঁর সহকর্মীরাও বিস্মিত হয়ে পড়েছিলেন। চ্যানেলটির মালিক বব নেলসন পরবর্তী সময়ে এক সাক্ষাৎকারে তাঁর ব্যক্তিগত জীবন ও বিয়ে নিয়ে হতাশার বিষয়টি উল্লেখ করেছিলেন।
তবে ক্রিস্টিনের মৃত্যুর কারণকে শুধু বিয়ে বা প্রেমের ব্যর্থতার সঙ্গে যুক্ত করে দেখার বিষয়ে সতর্কতা প্রয়োজন। তাঁর ব্যক্তিগত মানসিক অবস্থার পূর্ণাঙ্গ চিত্র সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য সীমিত।
ঘটনার কয়েক দিন আগেও সহকর্মীদের সঙ্গে একটি পার্টিতে অংশ নিয়েছিলেন ক্রিস্টিন। সেই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন ক্রীড়া সাংবাদিক ক্রেগ সেগারও। পরে তিনি স্মৃতিচারণ করে জানিয়েছিলেন, সেদিন ক্রিস্টিনকে বেশ হাসিখুশি দেখাচ্ছিল। তাঁর ধারণা ছিল না, সেটিই হয়তো সহকর্মীদের সঙ্গে ক্রিস্টিনের শেষ দিকের আনন্দঘন মুহূর্তগুলোর একটি।
লাইভ সম্প্রচারে ঘটে যাওয়া এই ঘটনা যুক্তরাষ্ট্রের টেলিভিশন সাংবাদিকতার ইতিহাসে গভীর আলোড়ন সৃষ্টি করে। পরবর্তী সময়ে চ্যানেল কর্তৃপক্ষ ঘটনার ভিডিও ফুটেজ নিজেদের হেফাজতে নেয়। সেটি আর সাধারণ দর্শকদের সামনে সম্প্রচার করা হয়নি।
তবে ক্রিস্টিনের মৃত্যুর পরও ‘Suncoast Digest’ অনুষ্ঠানটি কয়েক বছর চালু ছিল। পরে সেটি বন্ধ হয়ে যায়।
ক্রিস্টিন চাবাকের জীবন ও সেই মর্মান্তিক ঘটনাকে কেন্দ্র করে ২০১৬ সালে নির্মিত হয় ‘Christine’ নামের একটি চলচ্চিত্র। পরিচালক অ্যান্টোনিও ক্যাম্পোস নির্মিত এই সিনেমায় ক্রিস্টিনের চরিত্রে অভিনয় করেন রেবেকা হল।
সিনেমাটিতে একজন টেলিভিশন সাংবাদিকের পেশাগত জীবন, ব্যক্তিগত নিঃসঙ্গতা এবং মানসিক সংকটের বিভিন্ন দিক তুলে ধরা হয়েছে। মুক্তির পর চলচ্চিত্রটি সমালোচকদের প্রশংসা পায়।
প্রায় পাঁচ দশক পেরিয়ে গেলেও ক্রিস্টিন চাবাকের ঘটনাটি সংবাদমাধ্যমের ইতিহাসে আলোচিত হয়ে আছে। একই সঙ্গে ঘটনাটি মানসিক স্বাস্থ্য, ব্যক্তিগত নিঃসঙ্গতা এবং সংকটে থাকা মানুষের প্রতি সহমর্মিতার গুরুত্বও মনে করিয়ে দেয়।









মন্তব্য
এখনো কেউ মন্তব্য করেননি। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।