চিত্রনায়িকা পরীমনির বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির আদেশ দিয়েছেন আদালত। ব্যবসায়ী নাসির উদ্দিন আহমেদের করা মারধর ও ভয়ভীতি দেখানোর মামলায় নির্ধারিত সময়ে হাজির না হওয়ায় বুধবার (৪ নভেম্বর) এ আদেশ দেওয়া হয়। ঢাকার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মাহফুজুর রাহমান এ আদেশ দেন।
বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) মামলায় জামিন নিতে আদালতে যান পরীমনি।
২০২১ সালের ৬ জুলাই ঢাকার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট রাজীব হাসানের আদালতে মামলাটি করেন বোট ক্লাবের তৎকালীন সভাপতি ব্যবসায়ী নাসির উদ্দিন মাহমুদ। এতে পরীমনিসহ তিনজনকে আসামি করা হয়। মামলার অন্য দুই আসামি হলেন পরীমনির সহযোগী ফাতেমা তুজ জান্নাত বনি এবং কস্টিউম ডিজাইনার জুনায়েদ বোগদাদী জিমি ওরফে জিম।
এর আগে একই বছরের ১৪ জুন ঢাকা বোট ক্লাবে ধর্ষণ ও হত্যাচেষ্টার অভিযোগ এনে নাসির উদ্দিন মাহমুদ, তুহিন সিদ্দিকী, শাহ শহিদুল আলমসহ ছয়জনের বিরুদ্ধে সাভার থানায় মামলা করেন পরীমনি। ওই ঘটনার পর দুই পক্ষের পাল্টাপাল্টি অভিযোগ এবং বিভিন্ন ভিডিও প্রকাশ্যে আসায় বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা তৈরি হয়।
বোট ক্লাবের সেই রাতে কী ঘটেছিল?
২০২১ সালের ৯ জুন মধ্যরাতে সাভারের ঢাকা বোট ক্লাবে পরীমনি ও ব্যবসায়ী নাসির উদ্দিন মাহমুদের মধ্যে অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটে। ঘটনার কয়েক দিন পর ফেসবুকে স্ট্যাটাস এবং সংবাদ সম্মেলনে নিজের বক্তব্য তুলে ধরেন পরীমনি। তার অভিযোগ ছিল, সেদিন রাতে নাসির ও অমি তাকে জোর করে মদ পান করানোর চেষ্টা করেন। মদ পান করতে রাজি না হওয়ায় নাসির জোর করে তার মুখে মদের বোতল ঢুকিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেন।
তবে পরবর্তী সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া কয়েকটি ভিডিওতে ঘটনার ভিন্ন দৃশ্য দেখা যায় বলে দাবি করা হয়। ১০ সেকেন্ডের একটি ভিডিওতে নাসিরের সঙ্গে পরীমনিকে দুর্ব্যবহার করতে দেখা যায়। অন্য একটি ভিডিওতে ক্লাবের ভেতরে পরীমনিকে স্বেচ্ছায় মদ পান করতে দেখা গেছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। ওই সময় তার সঙ্গে ছিলেন অমি ও জিমি।
ভিডিওতে আরও দেখা যায়, উত্তেজিত পরীমনিকে শান্ত করার চেষ্টা করছেন নাসির। একপর্যায়ে তার সাথে দুর্ব্যবহার করেন পরীমনি এবং নাসিরকে ক্লাব থেকে বেরিয়ে যেতে বলেন। এসব ভিডিও প্রকাশের পর ওই রাতের ঘটনা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন ওঠে।
বোট ক্লাবের ঘটনার আগের রাতে গুলশানের অল কমিউনিটি ক্লাবে ভাঙচুর ও বারকর্মীদের মারধরের অভিযোগও আলোচনায় আসে। বনানীর একটি ক্লাবেও পরীমনির বিরুদ্ধে ভাঙচুরের অভিযোগ ওঠে। এসব ঘটনার পর তার অভিযোগের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে বিভিন্ন মহলে আলোচনা শুরু হয়।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাত দিয়ে জানা যায়, বোট ক্লাবের ঘটনার সময়কার কয়েকটি খণ্ডিত ভিডিও ফুটেজ সংগ্রহ করেছেন তদন্ত কর্মকর্তারা। এর মধ্যে একটি ভিডিওতে পরীমনিকে নাসিরকে গালাগাল করতে দেখা গেছে বলে দাবি করা হয়।
ক্লাবের কর্মীদের বক্তব্যের বরাত দিয়ে তদন্তসংশ্লিষ্টরা জানান, ঘটনার রাতে পরীমনি ও তার সঙ্গীরা ক্লাবে গিয়ে একটি টেবিলে বসে গল্প করতে করতে মদ পান করেন। প্রায় এক ঘণ্টা পর ব্লু লেবেল বিদেশি মদের একটি বোতল নেওয়াকে কেন্দ্র করে প্রথমে কথা-কাটাকাটি হয়। পরে তা হাতাহাতিতে গড়ায় বলে তাদের বক্তব্য।
নাসিরের মামলায় তদন্তে যা উঠে আসে
নাসির উদ্দিন মাহমুদের করা মামলায় অভিযোগ করা হয়, পরীমনি ও তার সহযোগীরা অ্যালকোহল পান করতে অভ্যস্ত। তারা বিভিন্ন নামীদামি ক্লাবে গিয়ে মদ পান করেন এবং পার্সেল নেওয়ার পর মূল্য পরিশোধ করেন না। এ ছাড়া পরিচিত পুলিশ কর্মকর্তাদের দিয়ে মিথ্যা মামলা করিয়ে হয়রানির ভয় দেখানোর অভিযোগও করেন নাসির।
মামলার এজাহারে নাসির উল্লেখ করেন, ২০২১ সালের ৯ জুন রাত ১২টার পর পরীমনি ও তার সহযোগীরা সাভারের বোট ক্লাবে প্রবেশ করেন। তারা দ্বিতীয় তলার শৌচাগার ব্যবহার করার পর ক্লাবের ভেতরে বসে মদ পান করেন।
২০২৪ সালে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (পিবিআই) ঢাকা জেলার পরিদর্শক মো. মনির হোসেন আদালতে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করেন। প্রতিবেদনে পরীমনি ও তার কস্টিউম ডিজাইনার জুনায়েদ বোগদাদী জিমি ওরফে জিমের বিরুদ্ধে মারধর ও ভয়ভীতি দেখানোর অভিযোগের সত্যতা পাওয়ার কথা জানানো হয়। তবে অপর আসামি ফাতেমা তুজ জান্নাত বনির বিরুদ্ধে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
পরে আদালত পিবিআইয়ের তদন্ত প্রতিবেদন গ্রহণ করে পরীমনি ও জিমকে হাজির হওয়ার জন্য সমন জারি করেন। ওই বছরের ২৫ জুন তারা ঢাকার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে হাজির হয়ে জামিন পান।
মামলাটির পাঁচ বছরের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও এখনো চূড়ান্ত রায় ঘোষণা হয়নি। এর মধ্যে অভিনয়ের পাশাপাশি বিভিন্ন আইনি প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হতে হয়েছে পরীমনিকে। মাদক মামলার অভিযোগ, পাল্টাপাল্টি মামলা, হাজিরা, রিমান্ড ও জামিন নিয়ে কয়েক বছর ধরেই আইনি জটিলতায় রয়েছেন তিনি।









মন্তব্য
এখনো কেউ মন্তব্য করেননি। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।