বাংলা সাহিত্যের প্রতিবাদী ও গণমানুষের কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের জন্মশতবর্ষ উপলক্ষে চট্টগ্রামে আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে উদীচী চট্টগ্রাম জেলা সংসদ। অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেছেন, সুকান্তের কবিতায় শোষণমুক্ত, বৈষম্যহীন ও মানবিক সমাজের স্বপ্ন উচ্চারিত হয়েছে। তাঁর জীবনদর্শন ও সংগ্রামী চেতনা নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে হবে।
বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) সন্ধ্যায় নগরের থিয়েটার ইনস্টিটিউট মিলনায়তনে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এতে কবি, সাহিত্যিক, শিল্পী, সংস্কৃতিকর্মীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশ নেন।
আলোচনা সভায় কবি ও সাংবাদিক আবুল মোমেন বলেন, ষাটের দশকে প্রগতিশীল সমাজের আন্দোলনে রবীন্দ্রনাথ, নজরুল ও সুকান্তের বড় অবদান রয়েছে। তাঁদের মধ্যে সুকান্ত ছিলেন সবচেয়ে কনিষ্ঠ ও স্বল্পায়ু। মাত্র ২১ বছর বয়সে তাঁর বিপুল সৃষ্টিকর্ম বিস্ময়কর। তিন কবির সাহিত্যকর্মে অসাম্প্রদায়িক সমাজব্যবস্থার আকাঙ্ক্ষা ফুটে উঠেছে। তবে সেই সমাজ এখনো গড়ে তোলা সম্ভব হয়নি।
তিনি বলেন, একাত্তর সালে সেই সমাজ গড়ার সুযোগ তৈরি হয়েছিল। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বিরোধী শক্তি এখনো সক্রিয়। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের অনেকেও সেই চেতনায় অবিচল থাকতে পারেননি।
বর্তমান প্রজন্মের সাহিত্যপাঠের অভ্যাস নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন আবুল মোমেন। তিনি বলেন, তরুণদের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথ, নজরুল ও সুকান্তের সংযোগ ক্রমেই কমছে। পাঠ্যবইয়ের বাইরে সাহিত্যপাঠের চর্চাও কমে গেছে। আনন্দদায়ক ও নিরীক্ষামূলক শিক্ষার মাধ্যমে নতুন প্রজন্মকে সাহিত্যের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। রবীন্দ্রনাথ, নজরুল ও সুকান্তকে আবার স্কুলে ফিরিয়ে নিতে হবে।
প্রাবন্ধিক ও সাংবাদিক সুভাষ দে বলেন, সুকান্ত আমৃত্যু মার্কসবাদী দর্শনে বিশ্বাসী ছিলেন। সমাজ বিপ্লবের আকাঙ্ক্ষা তাঁর কবিতায় বারবার উঠে এসেছে। সৃষ্টিকর্মের মধ্য দিয়ে তিনি সমকালীন বাস্তবতা গণমানুষের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন। বাংলা সাহিত্যে সুকান্ত বিপ্লবের কণ্ঠস্বর। শোষিত শ্রমজীবী মানুষের লড়াইয়ে তাঁর কবিতা অন্যতম আশ্রয় হয়ে থাকবে।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগের সাবেক অধ্যাপক আবুল মনসুর বলেন, প্রযুক্তির অগ্রগতিতে মানুষের জীবনযাত্রা ও চিন্তার জগতে পরিবর্তন এসেছে। বাম রাজনীতিতেও নতুন নতুন চিন্তার বিকাশ ঘটছে। এ বাস্তবতায় সুকান্তকে প্রাসঙ্গিক রেখেই রাজনৈতিক চিন্তার জগৎ নতুনভাবে সাজাতে হবে।
কবি ও নাট্যজন অভীক ওসমান বলেন, একজন কিশোর কবি পুরো ভারতবর্ষকে আলোড়িত করেছিলেন। তবে বর্তমান সময়ে লড়াই-সংগ্রামে সুকান্তকে কতটা প্রাসঙ্গিক রাখা গেছে, তা ভাবতে হবে। একসময় গ্রামগঞ্জে রবীন্দ্রনাথ, নজরুল ও সুকান্তের জন্মজয়ন্তী পালিত হতো। এখন এসব আয়োজন প্রায় বিলুপ্তির পথে। সমাজ পরিবর্তনের কথা বললে তাঁদের সাহিত্য ও আদর্শের চর্চাও ফিরিয়ে আনতে হবে।
উদীচী চট্টগ্রাম জেলা সংসদের আহ্বায়ক বীর মুক্তিযোদ্ধা অমল কান্তি নাথের সভাপতিত্বে এবং যুগ্ম আহ্বায়ক অধ্যাপক শীলা দাশগুপ্তার সঞ্চালনায় আলোচনায় আরও অংশ নেন কবি ইউসুফ মুহাম্মদ ও কেন্দ্রীয় উদীচীর সহসভাপতি বেলায়েত হোসেন। স্বাগত বক্তব্য দেন উদীচী চট্টগ্রাম জেলা সংসদের সদস্য শিমুল সেন।
আলোচনা শেষে সাংস্কৃতিক পর্বে উদীচী ও রাগেশ্রীর শিল্পীরা দলীয় সংগীত পরিবেশন করেন। সুরাঙ্গ্রী পরিবেশন করে ‘রানার’ শিরোনামের নৃত্য। তারুণ্যের উচ্ছ্বাস ও বোধন দলীয় আবৃত্তিতে অংশ নেয়। একক আবৃত্তি করেন সোমা মুৎসুদ্দি, অঞ্চল চৌধুরী, ফারুক তাহের ও বেলায়েত হোসেন। একক গান পরিবেশন করেন জয় নেন, ভাস্কর রায়, বিউটি দেব ও বর্ণালী দাশ।









মন্তব্য
এখনো কেউ মন্তব্য করেননি। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।